এডিটর’স মাইন্ড

‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুঁশিয়ার!’

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৯ জুলাই, ২০২২


Thumbnail ‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুঁশিয়ার!’

আগামীকাল পবিত্র ঈদুল আজহা। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর আশা করেছিলাম এবার ঈদ হবে উৎসবমুখর। কিন্তু বেশ কিছু কারণে উৎসব মলিন, বিবর্ণ। হঠাৎ লোডশেডিং যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। গত ১০ বছরে লোডশেডিংয়ের কথা মানুষ ভুলেই গিয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট জমানায় বিদ্যুৎ মাঝেমধ্যে আসত। বেশির ভাগ সময় দেশ ডুবে থাকত অন্ধকারে। সারা দেশে ১২ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হতো। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়। গত ১৩ বছরে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সাফল্যের একটি- বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি। আওয়ামী লীগ কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করেনি, সবার জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করেছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় যেখানে দেশের মাত্র ৪০ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেত, বর্তমানে প্রায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতির কারণে এখন ফ্রিজ, টিভি, এয়ারকুলার আর বিলাসিতা নয়। প্রত্যেক মানুষের জীবনযাপনের অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়েছে। মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এ সময় নতুন করে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা মানুষ মেনে নিতে পারছে না। সরকারের পক্ষ থেকে লোডশেডিংয়ের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাজারে জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে লোডশেডিং মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে গত ১৩ বছরের সব অর্জন এ কদিনে যেন উবে গেছে। আগে কী ছিল, এ নিয়ে কেউ আলোচনায় আগ্রহী নয়। বর্তমান সংকট নিয়েই জনগণ উদ্বিগ্ন, চিন্তিত, অসন্তুষ্ট। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শুধু যে বাসাবাড়িতে সমস্যা হচ্ছে, তা নয়। বরং তার চেয়েও বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে শিল্পকারখানা ও কৃষিতে। শিল্পোদ্যোক্তারা গ্যাস পাচ্ছেন না। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিতে সেচের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা না হলে খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হবে। শঙ্কার কালো মেঘ যেন পুঞ্জীভূত হচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংকটের অবয়ব ফুটে উঠছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। আমাদের অর্থনীতির একটা বড় ভিত্তি হলো প্রবাসী আয়। গত অর্থবছরের হিসাবে দেখা যায়, প্রবাসী আয় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। তবে ঈদের আগে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। ঈদের আগে পাঁচ দিনে ৫ হাজার কোটির বেশি টাকা পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। কিন্তু এও আশা জাগাতে পারছে না। প্রতিটি ঈদেই প্রবাসী ভাইবোনেরা আত্মীয়-পরিজনের জন্য বাড়তি টাকা পাঠান। এটি ধারাবাহিকভাবে না এলে আমাদের রিজার্ভে চাপ বাড়বে। সরকার নতুন অর্থবছর শুরুই করেছে কৃচ্ছ্র নীতির মাধ্যমে। আগেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। নতুন অর্থবছরে গাড়ি কেনা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি নানা ব্যয় কাটছাঁট করা হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের যে চাপ বাড়ছে এটা আর কোনো গোপন বিষয় নয়। প্রশ্ন হলো, এ চাপ কত দিন থাকবে? অর্থনৈতিক সংকট আর কত গভীর হবে? করোনা-পরবর্তীতে এমনিতেই স্বল্প আয়ের মানুষ সংকটের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। এখন অর্থনৈতিক সংকট মধ্যবিত্তকেও অন্ধকার টানেলে নিয়ে গেল। আওয়ামী লীগ সরকার যে টানা ১৩ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে তার বড় কারণ অর্থনীতি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা, নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্কের পরও সাধারণ মানুষ এ সরকারের ওপর আস্থা রেখেছে। এর বড় কারণ আওয়ামী লীগ সরকার ১৩ বছরে ধারাবাহিকভাবে অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে গেছে। দেশে কর্মমুখরতা বেড়েছে। মানুষের আয় বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা মানুষের স্বপ্নের সীমাটা আওয়ামী লীগ অনেক বাড়িয়েছে। ফলে এখনকার সংকটটা জনগণকে অস্থির করে তুলেছে। ১০ বছর আগে যে লোকটি মাসে ১০ হাজার টাকা উপার্জন করত এখন তার মাসিক আয় ১ লাখ টাকা। কিন্তু নানা সংকটে তার আয় কমে যখন ৫০ বা ৬০ হাজারে নেমেছে, তখন সে আর চলতে পারছে না। অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজে লোভ, দুর্নীতি বেড়ে গেছে। যে কোনো উপায়ে ধনী হওয়ার এক উদগ্র ভয়ংকর নেশা কারও কারও মধ্যে ঢুকে গেছে। এরা নানা প্রতারণায় জড়িয়ে সমাজকে আরও অসুস্থ করে তুলছে। অনলাইন কেনাকাটায় দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, পি কে হালদারের হাজার কোটি লোপাটের কাহিনি, বিদেশে অর্থ পাচার, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার পাহাড়- অসুস্থ সমাজের নোংরা অর্থনীতির চিত্র। সমাজের নীতি-নৈতিকতা পর্যুদস্ত হচ্ছে ভ্রষ্ট উচ্চাকাক্সক্ষার কারণে। এজন্যই শিক্ষাঙ্গনগুলোয় ভয়ংকর চিত্র। শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো, শিক্ষককে হত্যা- শিক্ষাঙ্গনের দুর্ভাগ্যজনক চেহারাকে উন্মোচন করেছে। এ চিত্র শুধু সবখানে নয়, সর্বত্র। মানুষ আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। ১৩ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার আগে এ রকম সর্বগ্রাসী চাপে পড়েনি। চারপাশ যেন বৈরী হয়ে উঠেছে এ সরকারের জন্য। ১৩ বছর ধরে দেশ পরিচালনা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলতে গেলে একাই তিনি সবকিছু সামাল দিচ্ছেন। বন্যা মোকাবিলা থেকে দুর্নীতি বন্ধ। কৃষির উৎপাদন থেকে শ্রমিকের মজুরি সবকিছুই দেখভাল করতে হচ্ছে তাঁকে। দেশের অবস্থা আজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া শিশুদের একটা খেলার মাঠও বেদখল হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আছেন তাই এখনো মানুষ কিছুটা হলেও আশাবাদী। আবার আওয়ামী লীগ সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী-এমপির ওপর মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না। তাঁরা কেন দায়িত্বে আছেন সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জনগণ ক্লান্ত।

এ কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে, বিশ্বজুড়েই এখন টালমাটাল অবস্থা। করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে এক অস্থির-অনিশ্চয়তার মধ্যে নিয়ে গেছে। কোনো দেশই ভালো নেই। যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত বিশ্বে অন্যতম অনিরাপদ দেশে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন সেখানে গুলিতে ঝরছে নিরীহ প্রাণ। বাদ যাচ্ছে না শিশুও। জো বাইডেনের জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে। এত আবেদনহীন প্রেসিডেন্ট কবে যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে। ভারতে চলছে নানামুখী সংকট। রুপির রেকর্ড অবনমন হয়েছে ডলারের বিপরীতে। উগ্র হিন্দুত্ববাদ সেক্যুলার ভারতের চেহারাটা ফ্যাকাসে করে দিয়েছে। নূপুর শর্মা একাই মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছেন। ইউরোপজুড়ে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে ইউরোপ। সত্তরের মহামন্দাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। দেশে দেশে অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা দানা বেঁধে উঠছে। উত্তপ্ত এ বিশ্ব পরিস্থিতির বাইরে নয় বাংলাদেশ। কিন্তু সাধারণ মানুষ বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে ভাবে না। বুঝতেও চায় না। তারা চায় সুখে-শান্তিতে থাকতে। আয়-উন্নতি বাড়াতে। চায় সহনীয় দ্রব্যমূল্য। স্বস্তিদায়ক সামাজিক পরিবেশ। সন্তানের নিরাপদ শিক্ষা। দুর্ঘটনামুক্ত যাতায়াত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলে মানুষকে বেশিদিন আশ্বস্ত রাখা যাবে না। এ আওয়ামী লীগ সরকারই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৮-এর বিশ্বমন্দা সামাল দিয়েছে। করোনার বিশ্ব সংকটের মুখেও অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে গেছে। এবার পারছে না কেন? এর কারণ মন্ত্রী ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের সীমাহীন অযোগ্যতা এবং দুর্নীতি। আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরতা। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা এবং আরও কিছু বাস্তবতা। বিদ্যুৎ সংকটের কথাই যদি আমরা একটু আলোচনা করি তাহলে ব্যর্থতার উৎস খুঁজে পারব। আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে সত্যি কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে জোর দেয়নি। তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানে যত মনোযোগী ছিল ততই উপেক্ষিত ছিল স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে সরকার বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-দর্শন ও আদর্শ বিচ্যুত হয়েছে।

জাতির পিতা ১৯৭৫-এর ৯ আগস্ট বিশ্বখ্যাত শেল অয়েল কোম্পানির কাছ থেকে তাদের মালিকানাধীন পাঁচটি গ্যাস ক্ষেত্র ও তিতাস গ্যাস কোম্পানির শেয়ার ৪.৫০ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনে নেন। এটি ছিল বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার এক মাইলফলক। আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর কৌশলের বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছে। গত ১০ বছরে সরকার নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান কূপগুলো আধুনিকায়নে মনোযোগী ছিল না। এলএনজি আমদানির এক জুয়ায় মত্ত ছিল। এটি পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক জোড়াতালি। গ্যাস আমদানিতে কমিশন বাণিজ্যের লোভনীয় হাতছানিও ঝুঁকিপূর্ণ এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলারা সরকারকে প্ররোচিত করেছে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ আমদানি করে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে পারবে না, এটি জাতির পিতা উপলব্ধি করেছিলেন। আমলারা উপেক্ষা করেছেন। আমলাতন্ত্রের একটি প্রবণতা হলো, যে কোনো সমস্যার গভীরে না যাওয়া। তাৎক্ষণিকভাবে সংকটের সমাধান খোঁজা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন পর্যন্ত মানা হয়নি। এখন যখন বিশ্ববাজারে এলএনজির লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি তখন আমদানি সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। নির্বাচনের আগে সরকারকে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

শুধু বিদ্যুৎ কেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধŸগতির পেছনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতা সরকারের অর্জন বিবর্ণ করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী কখন কী বলেন তা যদি পরে তিনি শুনতেন তাহলে হয়তো নিজেই লজ্জা পেতেন। খুব কম ক্ষেত্রেই মন্ত্রীরা মন্ত্রণালয় চালাতে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। বরং তাঁরা সব সিদ্ধান্তের ভার ছেড়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ওপর। মন্ত্রীদের কাজ শুধু বক্তৃতা আর ফিতা কাটায় বন্দি হয়ে আছে। টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। এবারের মতো এত অনুজ্জ্বল মন্ত্রিসভা আওয়ামী লীগ আগে কখনো গঠন করেনি। মন্ত্রীরা পালাক্রমে বিতর্কিত বক্তব্য দিচ্ছেন। সরকারের রাজনৈতিক চেহারা নেই। আওয়ামী লীগ নেতারাই মনে করেন দেশ আমলারা চালাচ্ছেন। আমলারা ভবিষ্যৎ ভাবেন না। জনপ্রিয়তা নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা নেই। হেভিওয়েট জনপ্রিয় নেতারা সাইডলাইনে বসে তামাশা দেখছেন। নির্বাচন তাঁদের পরিকল্পনায় জায়গা পায় না। তাঁরা আজ এবং বর্তমান নিয়েই শুধু ভাবেন। নিজেদের স্বার্থ তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য। আমলাদের হাতে দেশ ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যে মারামারি-খুনোখুনি করছে। অনেকেই আখের গুছিয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিয়েছেন। ১৩ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা, পাতিনেতা এমনকি সিকিনেতাও জনগণকে চাকরবাকর ভাবতে শুরু করেছেন। বড় হলে উদার হতে হয়। নত হতে হয়। বিনয়ী হতে হয়। এটা আওয়ামী লীগের কেউ কেউ ভুলে গেছেন। কোথাও কোথাও এমন উদ্ধত আচরণ করা হচ্ছে যে তাতে সাধারণ মানুষ বিরক্ত, হতাশ। অন্য রাজনৈতিক দল বিশেষ করে সমমনা দলের সঙ্গেও আওয়ামী লীগ দূরত্ব তৈরি করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও উপেক্ষা করার প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক দল হিসেবেও আওয়ামী লীগ একলা। দলে নিবেদিতপ্রাণ, ত্যাগীরা কোণঠাসা। কেউ কেউ হতাশ হয়ে দূরে সরে গেছেন। এ অবস্থায় ক্রমে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলটি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সামাল দিতে আওয়ামী লীগ এখন অনেকটাই প্রশাসননির্ভর। দুঃসময়ের কর্মীরা কি আবার কোনো সংকটে মাঠে নামবে? কেন নামবে? এসব প্রশ্ন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যেই।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের সফল কূটনীতি গত তিন বছরে মুখ থুবড়ে পড়েছে। কূটনীতির ভাষার বদলে একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাড়া-মহল্লার আড্ডার ভাষায় বয়ান দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এ রকম একজন ‘আনডিপ্লোম্যাটিক’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কবে পেয়েছে বাংলাদেশ! যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো আগামী নির্বাচন ঘিরে সরব। ১৪টি দেশের কূটনীতিকরা একযোগে নির্বাচন কমিশনে গেছেন। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী নির্বাচন তাঁরা অংশগ্রহণমূলক চান। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ চান। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচন নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কি বৃহত্তর গণতন্ত্রের পথে এগোবে নাকি কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থার দিকে এগোবে।’ এর বিপরীতে বাংলাদেশের নীতি ও কৌশল ধোঁয়াশে, অস্পষ্ট।

সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের মাত্র দেড় বছর আগে এক উত্তাল সাগরে আওয়ামী লীগের অভিযাত্রা। সাগর ক্রমে বৈরী হয়ে উঠছে। ১৩ বছরের অর্জন যে এক লহমায় বিলীন হয়ে যায়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুৎ নিয়ে আওয়ামী লীগ গর্ব করত। এখন এ বিদ্যুৎই যেন গলার ফাঁস হয়ে গেছে। ২০০১-২০০৮-এর অবস্থায় আবার ফিরে যাচ্ছি আমরা। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে কী ছিল তা এখন বলে লাভ নেই। খাম্বা কাহিনিতেও মানুষ সান্ত¡না খুঁজবে না। আজকের সংকটের সমাধান চায় মানুষ। ১৩ বছরে এ দেশের অর্জন অনেক। অবিশ্বাস্য। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল উন্নয়নের বড় বিজ্ঞাপন হয়ে আছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। গড় আয়ু বেড়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু এসব অর্জন নিয়ে জনগণ উদ্বেলিত হবে না, যদি লোডশেডিং না থামে। যদি বাজারের আগুন বন্ধ করা না যায়। কিশোর গ্যাংয়ের দাপট না কমে। ক্ষমতাসীনদের অহংকার, দুর্নীতি, টাকা পাচার, সামাজিক অবক্ষয় মানুষকে অস্থির করে তুলছে। বাংলাদেশের জনগণের গোল্ডফিশ মেমোরি। অতীত খুব সহজেই, খুব দ্রুত ভুলে যায়। ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকার বেদনা ভুলে গেছে। তারেক জিয়ার হাওয়া ভবন ভুলে গেছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ভুলে গেছে। বাংলা ভাই ভুলে গেছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র ভুলে গেছে। পূর্ণিমা-ফাহিমার ধর্ষণ ভুলে গেছে। মসজিদে ঢুকে হত্যা মনে রাখেনি। মনে রাখেনি দেশজুড়ে বিএনপি-জামায়াতের তান্ডব। অতীত নয়, বর্তমান নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। বর্তমান বাস্তবতায়ই মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়। তাই আওয়ামী লীগ সরকারকেই চলমান সংকটগুলোর সমাধান করতে হবে। আর এ সংকট এখন এ সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে, তৃতীয় মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান অবস্থা দেখে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু...’ গানটি মনে পড়ছে খুব বেশি করে। এ গানের একটি পঙ্ক্তি এ রকম ‘দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুঁশিয়ার!’

তবে আমাদের আশা-ভরসার জায়গা একটাই। শেখ হাসিনা। সব সংকট তিনি সমাধান করেন আপন মেধায়, দূরদর্শিতায়। যেখানে ঘোর অনিশ্চয়তার অন্ধকার সেখানে তিনি সম্ভাবনার আলো জ্বালান। বর্তমানে ধেয়ে আশা সমস্যাও তিনি সমাধান করবেন, এখনো দেশবাসী এটা বিশ্বাস করে। এজন্যই ক্ষোভ, দুঃখ-হতাশার পরও জনগণ অপেক্ষা করছে শেখ হাসিনার আরেকটি ম্যাজিকের। শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের একমাত্র কান্ডারি। নিশ্চয়ই তিনি এ সংকটের উত্তাল তরঙ্গ পাড়ি দিয়ে আমাদের নিরাপদে পৌঁছে দেবেন সুবর্ণ বন্দরে।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
Email: poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লোডশেডিং   নির্বাচন   বিশ্বজুড়ে   সংকট  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

বিএনপি যদি আবার ক্ষমতায় আসে

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০১ অক্টোবর, ২০২২


Thumbnail বিএনপি যদি আবার ক্ষমতায় আসে

১ অক্টোবর ২০০১। ২১ বছর আগের এ দিনটা আমরা কজন মনে রেখেছি? ওইদিন বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০০১ সালের ১৩ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা ঘটে। পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। রাত ১০টার দিকেই বোঝা যায় বিএনপি-জামায়াত জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। কিন্তু বিপন্ন বিস্ময়ের তখনো অনেক বাকি। রাতেই বিএনপি-জামায়াতের সব ক্যাডার ঝাঁপিয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘুদের ওপর। ১৯৭১-এর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর আদলে সারা দেশে শুরু হয় হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ। এক নারকীয় উৎসব। মুহূর্তে নিরীহ মানুষের আর্তনাদ বিএনপি-জামায়াতের জয়োল্লাস ম্লান করে দেয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার নিয়ন্ত্রিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিথর মূর্তির মতো তামাশা দেখতে থাকে। এ সেই পয়লা অক্টোবর যেদিন বাংলাদেশ প্রতিহিংসার নির্মমতা দেখেছিল। ভয়ে শিউরে উঠেছিল। জার্মান নাৎসিদের মতো প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে দাও- এ বন্য হিংস্রতার এক ভয়াবহ রূপ দেখেছিল বাংলাদেশ। ওইদিন একজন সিনিয়র সাংবাদিক আমাকে বলছিলেন, ‘এটাই বিএনপির পতনের শুরু।’ ১ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচনে সংখ্যালঘু নিধন চলে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ‘খতম’ করে আওয়ামীমুক্ত বাংলাদেশ নির্মাণের অভিযান চলে। ওই ১০ দিন দেশে কোনো আইন ছিল না। বিএনপি নেতা-কর্মীদের ইচ্ছাই হলো আইন। ১০ অক্টোবর শপথ নেয় বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এরপর বাংলাদেশ প্রবেশ করে এক কৃষ্ণগহ্বরে। কেমন ছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বাংলাদেশ? কজন মনে রেখেছেন সেই ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’র কথা। ২০০৬ সালে নানা নাটক করে বিএনপি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান করে। আসলে ক্ষমতার চাবি ছিল বেগম জিয়ার হাতেই। মূলত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নিলেই এ দেশ বিএনপি-জামায়াতের সেই দমবন্ধ শাসনের অবসান হয়। সেই থেকে প্রায় ১৬ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে।

ক্ষমতার গর্ভে জন্ম নেওয়া একটি রাজনৈতিক দলের জন্য ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। এ যেন জলের মাছের ডাঙায় জীবন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি ভাঙেনি। এও এক বিস্ময়। টিকে থাকার জন্য সংগ্রামরত দলটি এখন সরকার পতনের ডাক দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা পুনঃ প্রবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। দলটির নেতারা এসব কর্মসূচিতে লাঠিসোঁটা নিয়ে যোগ দেওয়ার জন্য কর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন। আরেক নেতা এতেও খুশি নন। তিনি আরও এক কাঠি সরেস। তিনি কর্মীদের আরও বড় লাঠি নিয়ে সমাবেশে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রশাসন-পুলিশকে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এ ধরনের কর্মসূচি দিতেই পারে। নির্বাচনের আগে সংগঠন গোছাতে, কর্র্মীদের উজ্জীবিত করতে এটা ভালো কৌশল। কিন্তু আমার অবাক বিস্ময় অন্য জায়গায়। বিএনপি নেতাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে তাঁরা যেন দেবদূত। ভিনগ্রহ থেকে আসা সফেদ মানব। একটি রাজনৈতিক দল যখন জনগণের কাছে যায় তখন তাদের স্বচ্ছ ও পরিষ্কার থাকা উচিত। ভালোমন্দ মিলিয়েই একজন মানুষ। একটি রাজনৈতিক দলও। যে-কোনো একটি রাজনৈতিক দলের অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব হলো আত্মসমালোচনা। নিজেদের ভুলভ্রান্তিগুলো বুঝতে পেরে তা সংশোধন করা। বিএনপি দুই মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল। এ সময় বিএনপি যে ভুলগুলো করেছে তা স্বীকার করে তারা জনগণের কাছে যাবে বলেই একজন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বিএনপি নেতাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তাঁদের শাসনামলে বাংলাদেশের মানুষ স্বর্গে ছিল। আসলে কেমন ছিল তখনকার বাংলাদেশ?

বুধবার দেখলাম ছাত্রদল নেতাদের পেটানোর ঘটনায় ক্ষুব্ধ বিএনপি মহাসচিব। টেলিভিশনে দেখলাম বলছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের মধ্যযুগীয় কায়দায় পেটানো হয়েছে।’ মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘সরকার ফ্যাসিস্ট কায়দায় বিরোধী দলকে আক্রমণ করছে। বিএনপি নেতা-কর্মীদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। পেটানো হচ্ছে।’ প্রথমেই বলে নিই, বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া, পেটানো কিংবা হামলা কোনো গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার নয়। মিরপুরে, বনানীতে, ভোলায়, মুন্সীগঞ্জে যারা এটা করেছেন, অন্যায় করেছেন। এতে আওয়ামী লীগ ও সরকারের লাভ হয়নি। ক্ষতি হয়েছে। এসব খুবই বাজে দৃষ্টান্ত। কিন্তু বিএনপি নেতারা কি একবার বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, ক্ষমতায় থাকার সময় এর চেয়েও জঘন্য কাজ তাঁরা করেননি? ১ অক্টোবর, ২০০১ থেকে ১০ অক্টোবরের পত্রিকার পাতাগুলো কি বিএনপি নেতারা একবার চোখ বুলিয়ে দেখবেন?

২০০২ সালের মার্চে আওয়ামী লীগ নেতা বাহাউদ্দিন নাছিমকে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রাজধানী ঢাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কারাগারে বন্দিকালীন অবস্থায় তাঁর হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। একটি ব্যাগ দিয়ে তাঁর মাথা ঢেকে সিলিংফ্যানের সঙ্গে উল্টো করে ঝোলানো হয়। পানিভর্তি বোতল দিয়ে তাঁর নিতম্ব, হাঁটু, কোমর, বাহু ও যৌনাঙ্গে আঘাত করা হয়। ফ্যান চালু করে তাঁর শরীর চারদিকে ঘোরানো হয়। বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। এভাবে পাঁচ দিন ধরে তাঁকে নির্যাতন করা হয়।’ শুধু বাহাউদ্দিন নাছিম একা নন। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুনের মতো ব্যক্তিত্বদের পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা, শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যার মতো সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাদের বেছে বেছে হত্যার ব্যাপারে বিএনপি নেতারা কী বলবেন? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়ে নতুন করে আবার কিছু বলতে চাই না। কিন্তু বিএনপির ‘সাধু’ নেতারা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, ওই ঘটনায় তাঁদের দায় নেই? বলে রাখা দরকার, ছাত্রলীগের কতিপয় দুর্বৃত্ত যা করছে তা অমার্জনীয়। সেদিন আওয়ামী লীগের এক নেতা বলছিলেন, ‘সরকারের সব অর্জন ছাত্রলীগই খেয়ে ফেলছে।’ ইডেন কলেজ থেকে চট্টগ্রাম। টেন্ডারবাজি থেকে ধর্ষণ। কোন অভিযোগ নেই ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে? কিন্তু আপনি যখন অন্যের সমালোচনা করবেন, তখন কি আয়নায় নিজের মুখটা একটু দেখবেন না?

বিএনপি-জামায়াত জোট যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল কী করেছে। চলুন একটু স্মৃতি হাতড়ে আসি। ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাত্রদলের দখলে চলে যায়। ২ অক্টোবর ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল করে নেয়। ১৮ অক্টোবর দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল এ রকম- ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ক্যাডাররা’। মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনা ঘটেছে; ২১ বছর আগে ২০০১ সালের ১৩ অক্টোবর একই ঘটনা ঘটেছিল। ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চাইলে তাদের বেধড়ক পেটানো হয়। ছাত্রলীগের বহু কর্মী পরীক্ষা পর্যন্ত দিতে পারেননি। ৩ নভেম্বর চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ কর্মীদের নির্বিচারে পেটানো হয়। এভাবেই বিএনপি-জামায়াতের পাঁচ বছর চলে ছাত্রলীগ নিধন কর্মসূচি। দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগকে দাঁড়াতে নেওয়া হয়নি। বিএনপির কোনো নেতা কি বলেছেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন ছাত্রদলের কর্মকান্ডে আমরা দুঃখিত, ব্যথিত। আবার ক্ষমতায় গেলে প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের ওপর এভাবে হামলা করা হবে না।’ এখন যে ছাত্রদলের কমিটি হয়েছে তা কি ছাত্রলীগের চেয়ে ভালো? ৩০২ জনের বিশাল কমিটি গঠনের পর ৩২ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসার কারণে বিএনপি নেতারাই তাদের বাদ দিয়েছেন। ছাত্রদলের কর্মীরাই বলছেন অছাত্র, খুনি আর মাদকসেবীদের আখড়া ছাত্রদল। বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে এ ছাত্রদল কী করবে?

বিএনপি এখন যে আন্দোলন করছে তার অন্যতম ইস্যু ‘লোডশেডিং’। সাধারণ মানুষ অতীত ভুলে গেছে। ভুলে গেছে বিদ্যুৎ ভোগান্তির সেই দুর্বিষহ স্মৃতি। কিন্তু বিএনপি নেতারা কী করে ভোলেন কানসাট ট্র্যাজেডির কথা! খাম্বা কাহিনি কি বিএনপি নেতাদের হৃদয়ের কোনায় ব্যথা জাগায় না? ১২ ঘণ্টার লোডশেডিং দেওয়া সেই বিএনপি যদি এখন ১-২ ঘণ্টার লোডশেডিং নিয়ে সমালোচনা করে তখন তো বুঝতে হবে দলটি জনগণের কথা ভাবে না। বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ‘ছায়া প্রধানমন্ত্রী’। তাঁর কথায় দেশ চলত। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কোনো সরকার কোনো দিন দিতে পারবে না।’ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কি বলতে পারবেন তাঁরা ক্ষমতায় এলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেবেন? তাহলে কি তারেক জিয়াকে মিথ্যাবাদী বলা হবে না?

দ্রব্যমূল্য নিয়েও বিএনপি নেতাদের আহাজারি চোখে পড়ার মতো। এ কথাও ঠিক, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সীমাহীন ব্যর্থতার কারণে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিছু মন্ত্রীর কথাবার্তা এমন বেসামাল পর্যায়ে চলে গেছে যে, তাঁদের দায়িত্ব কী তা-ও তাঁরা ভুলে গেছেন। এক মন্ত্রী দেখলাম কদিন আগে বলছেন, ‘ডিম আমদানি করা হবে কি না তা কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করব।’ ডিম তো কৃষিমন্ত্রীর এখতিয়ারাধীন বিষয় নয়। ডিম মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। কিন্তু ওই মন্ত্রীর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে কৃষিমন্ত্রী প্রতিদিন ডিম নিয়ে নানা রোমাঞ্চকর বক্তব্য দিয়েই চলেছেন। এসব অযোগ্যতা যে বাজারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে তা আওয়ামী লীগের নেতারাও স্বীকার করেন। কিন্তু বিএনপির আমল কি শায়েস্তা খানের যুগ ছিল? সে সময় অধ্যাপক আবুল বারকাত গবেষণা করে দেখালেন ‘শুধু চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনি, ডিজেল, কেরোসিনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় তখন এখনকার অর্ধেকেরও কম ছিল। সে সময় কাঁচা মরিচের কেজি উঠেছিল ১৬০ টাকায়। সব পণ্যের মূল্য পাঁচ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল। সেই ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করে অন্যকে গালি দেওয়া কি যুক্তিসংগত? বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে দ্রব্যমূল্য কমবে, এ গ্যারান্টি কি মির্জা ফখরুল দিতে পারবেন?

শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। ইদানীং বিএনপি মহাসচিব সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে খুবই উৎসাহী। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় কেমন ছিল এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর সবচেয়ে নির্মম পাশবিকতার শিকার হয়েছিল সংখ্যালঘুরা। শেফালী, পূর্ণিমা, কৃষ্ণার ধর্ষণের কথা এ দেশের সংখ্যালঘুরা কীভাবে ভুলবেন? অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক প্রতিবেদনে বলেছিল, ‘সংখ্যালঘু নির্মূলের এক অন্যায্য কর্মসূচির নীরব বাস্তবায়ন চলছে বাংলাদেশে।’ বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আরোহণের কদিন পর দুর্গাপূজা শুরু হয়। একটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল, ‘সারা দেশে নিরানন্দ পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু’। ২১ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন দৈনিকে খবর ছিল, মিরসরাই ও সীতাকুন্ডে প্রতিমা ভাঙচুর, চাঁদাবাজি, লুটপাট। বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই ছিল প্রতিমা ভাঙচুর, আতঙ্ক। এজন্য কি বিএনপি অনুতপ্ত? বিএনপি কি কখনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছে?

বিএনপি নেতারা প্রায় সবাই এখন অর্থনীতিবিদ। দেশের রিজার্ভ, অর্থনীতি, বিদেশি ঋণ ইত্যাদি বিষয়ে তোতাপাখির মতো জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দেন। সেদিন একজন বিএনপি নেতার কাছে জানতে চাইলাম- ভাই বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন রিজার্ভ কত ছিল? উনি কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, জানি না। তিনি না জানলেও বিএনপি নেতা রিজভী অবশ্য সব জানেন। রিজভী বললেন, ‘বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন সর্বকালের সর্বনিম্ন।’ একটু ভিরমি খেলাম। বইপত্তর ঘেঁটে দেখলাম অন্য তথ্য। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে কখনো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন ডলারই অতিক্রম করেনি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই অর্থমন্ত্রী দাতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। ২০০৩-এর ৬ নভেম্বর ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘অর্থনীতি বিপর্যস্ত। জরুরি সাহায্য দরকার।’ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে তিন পার্বত্য জেলার উন্নয়ন কার্মকান্ড স্থগিত করা হয়। ৯ নভেম্বর উপমন্ত্রী মণি স্বপন দেওয়ান বলেন, ‘অর্থনৈতিক মন্দার জন্য এ সিদ্ধান্ত’। ২০০৩-২০০৪ অর্থবছরে দাতাদের নির্দেশে আট দফা বাজেট সংশোধন করা হয়। সে সময় সাইফুর রহমান বলেছিলেন, ‘ঋণ নিলে বিদেশিদের কথা শুনতে হয়।’ এখান থেকেই বোঝা যায় গত এক যুগে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোথায় চলে গেছে। এখন যাঁরা ৩৭ বিলিয়ন ডলার নিয়ে আর্তনাদ করেন তাঁরা জ্ঞানপাপী। রিজভী হয়তো এ জ্ঞানপাপীদের খপ্পরে পড়েছেন। গত এক যুগে দুর্নীতি হয়েছে, অর্থ পাচার হয়েছে। কিন্তু বিপুল উন্নয়ন বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে। বিএনপি নেতারা এখন প্রায়ই বলেন, ‘এ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ সব দখল করে ফেলেছে।’ তাহলে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ঢাকা সিটি করপোরেশন দখল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে তালা ভেঙে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দখল, রাতের অন্ধকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যকে সরিয়ে উপাচার্যের চেয়ার দখল কী ছিল? বিএনপি ক্ষমতায় এসেই সংসদ ভবনের সব স্যুট দখল করে। এ সময় তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ বলেছিলেন, ‘এখন তো বিএনপি দখলদারদের হাত থেকে আমার চেয়ারও পাহারা দিয়ে রাখতে হবে বলে মনে হচ্ছে।’ (৭ অক্টোবর, ২০০১, দৈনিক ইত্তেফাক)।

দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। নিশ্চয় তাদের বেদনা আছে। ক্ষমতায় যাওয়ার তীব্র ক্ষুধা আছে। কিন্তু তার সঙ্গে আত্মোপলব্ধি থাকতে হবে। থাকা উচিত অনুশোচনা এবং অনুতাপ। সবার আগে বিএনপির উচিত তাদের অতীত কর্মকান্ডের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা। অনুতপ্ত হওয়া। কিন্তু ইদানীং বিএনপি নেতাদের কথাবার্তায় দম্ভোক্তি প্রকাশ্য। বিএনপি নেতারা এখন যেসব কথাবার্তা বলছেন তাতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে কী কী হতে পারে সে সম্পর্কে আমরা একটি ধারণা করতে পারি। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় এলে বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী হবেন। তাঁর অবর্তমানে তারেক জিয়া দায়িত্ব নেবেন।’ তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এ দুজনই স্ট্রাইকার এবং ফিনিশার।’ তাহলে তো বিএনপি ক্ষমতায় এলেই সুপ্রিম কোর্ট দখল করে নেবে। গতবার তারা সাবেক নেতাকে প্রধান বিচারপতি করার জন্য সংবিধান সংশোধন করেছিল। এবার স্থায়ী কমিটির সদস্যকে প্রধান বিচারপতি বানাতে হবে। আইন ওই সংবিধান পাল্টাতে হবে। বলতে হবে, পলাতক, দন্ডিত থেকেও প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য হওয়া যায়। বিএনপি নেতারা প্রচ- উন্নয়নবিরোধী। তাঁরা প্রায়ই বলেন, উন্নয়নের বেলুন চুপসে গেছে। সব আওয়ামী ভাঁওতা। গালগল্প। শুধু দুর্নীতি হয়েছে। তাহলে বিএনপি ক্ষমতায় এলেই পদ্মা সেতু ভেঙে ফেলা হবে। ধ্বংস করা হবে মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পসহ সব উন্নয়ন চিহ্ন। বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট হয়েছে। তাই সব বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হবে। দিনে সূর্যের আলো, প্রকৃতির বাতাসে মানুষ কাজ করবে। আর রাতে জোছনায় ¯œান করবে। সারা দেশে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে।

বিএনপি নেতাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় আসল সমস্যা ‘বাংলাদেশ’টাতেই। তাই বিএনপি ক্ষমতায় এলে এ দেশটার নামই পাল্টে দেবে। দলের মহাসচিব কদিন আগে অবশ্য বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান আমলই ভালো ছিল!’ বিএনপি ক্ষমতায় এলে স্লোগান হবে ‘এসো পাকিস্তানে ফিরে যাই।’ বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে বাংলাদেশ কি আবার পাকিস্তান হবে?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

বিএনপি যদি   আবার   ক্ষমতায়   আসে  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মনোনয়ন পাবেন না আলোচিত ৫

প্রকাশ: ০৬:০০ পিএম, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail মনোনয়ন পাবেন না আলোচিত ৫

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রায় অর্ধেক আসনে বর্তমান সংসদ সদস্যদেরকে মনোনয়ন দিবে না। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্রগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা বলছেন, দেড়শ না আরও বেশিও হতে পারে। ইতোমধ্যে গত নির্বাচনে যারা প্রার্থী ছিলেন, নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের এলাকার অবস্থান যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে, এলাকায় তাদের অবস্থা, তাদের জনপ্রিয়তা, তারা কোনো বিতর্কে জড়িয়েছেন কিনা, সংগঠনবিরোধী কর্মকান্ডের সঙ্গে আছেন কিনা ইত্যাদি নিয়েও তথ্যানুসন্ধান চলছে, চলছে একাধিক মাঠ জরিপ। তবে এই সমস্ত তথ্য উপাত্তের পাশাপাশি এরকম কয়েকজন নেতা আছেন যারা নিশ্চিতভাবে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন না। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর ব্যাপারে ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি সুস্পষ্ট মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এবং আগামী নির্বাচনে যে তারা মনোনয়ন পাবেন না এই সম্পর্কে তাদেরকে বার্তাটা পরোক্ষভাবে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরকম তালিকায় যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন-

হাবিবে মিল্লাত: হাবিবে মিল্লাত সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচিত এমপি। তিনি তার এলাকায় বিভক্তির সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তার এলাকায় প্রায় বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগ এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভক্তি হচ্ছে। আওয়ামী লীগের বাইরে গিয়ে তিনি নতুন একটি গ্রুপ তৈরি করেছেন, এমন অভিযোগও উঠেছে। এই কারণেই তাকে সিরাজগঞ্জ আওয়ামী লীগের পদ থেকেও সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। হাবিবে মিল্লাত ইতোমধ্যেই লাল কার্ড পেয়েছেন বলে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

পঙ্কজ দেবনাথ: বরিশাল-৪ আসন থেকে নির্বাচিত পঙ্কজ দেবনাথকে সাম্প্রতিক সময়ে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। যদিও এ অব্যাহতি মানে এই নয় যে তিনি আর সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। এখন তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল রয়েছেন। তবে আগামী নির্বাচনে তিনি যে বরিশাল-৪ থেকে মনোনয়ন পাচ্ছেন না এটা মোটামুটি নিশ্চিত। 

মুরাদ হাসান: জামালপুর-৪ আসন থেকে নির্বাচিত মুরাদ হাসান তথ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তারপর তার বিভিন্ন রকম অসংলগ্ন কথাবার্তার জন্য তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর তিনি পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পরই তার এলাকার বিভিন্ন কমিটি থেকে তাকে বাদ দেয়া হয়। বর্তমানে পর্দার আড়ালে আছেন মুরাদ হাসান। কিন্তু আগামী নির্বাচনে তিনিও মনোনয়ন পাবেন না বলেই নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে। ওই নির্বাচনী এলাকায় একাধিক ব্যক্তি এখন নির্বাচন প্রচারণার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।

হাজী সেলিম: ঢাকা-৭ থেকে নির্বাচিত হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলার রায় হয়েছে এবং ওই মামলায় তিনি দণ্ডিত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। এ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তবে সংসদ সদস্য বাতিল হোক না হোক, সর্বোচ্চ আদালতের রায় যদি শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে তবে আগামী নির্বাচনে হাজী সেলিমকে দেখা যাবে না।

খন্দকার মোশাররফ হোসেন: ফরিদপুর-৩ থেকে নির্বাচিত দুইবারের এমপি খন্দকার মোশাররফ হোসেন আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাচ্ছেন না, এটি মোটামুটি নিশ্চিত। ফরিদপুরে তার ঘনিষ্ঠ লোকজনের ব্যাপক অর্থপাচার, লুটপাট, দুর্নীতির অভিযোগ গণমাধ্যমে বছর জুড়েই চাউর হয়েছে এবং এই সমস্ত অভিযোগে তার সহকারী একান্ত সচিব এবং তার ঘনিষ্ঠ কর্মীদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমানে রাজনীতিতে তিনি এক ধরনের মৌনব্রত অবলম্বন করছেন এবং সবকিছু থেকেই তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে যে ফরিদপুর-৩ আসন থেকে তিনি নির্বাচন করছেন না, এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

এরকম আরও অন্তত ৩০ জন রয়েছেন, যারা ইতোমধ্যেই মাঠ ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগগুলো রয়েছে সেই সমস্ত অভিযোগগুলোর কারণে তারা আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন না বলে বার্তা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কতজন নতুন প্রার্থীকে সামনে আনবে সেটি চূড়ান্ত হবে আরও পরে।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মারিয়া কৃষ্ণা সাবিনা এবং একজন শেখ হাসিনা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail মারিয়া কৃষ্ণা সাবিনা এবং একজন শেখ হাসিনা

কৃষ্ণা রানী সরকার যখন কোনাকুনি শটে নেপালের জালে তৃতীয় গোলটি দিল তখন আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আবেগ ধরে রাখতে পারিনি, অনুমান করি আমার মতো অনেকেই ১৯ সেপ্টেম্বর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশে এখন নানা শঙ্কা, অনিশ্চয়তা, হতাশা। ব্যর্থতার চোরাবালিতে আটকে গেছে আমাদের প্রিয় ক্রিকেট। এর মধ্যে আমাদের মেয়েদের এ অসাধারণ সাফল্য যেন তীব্র দাবদাহে এক পশলা বৃষ্টি। এ সাফল্য কেবল সাফজয় নয়। আমি এটাকে কেবল একটি টুর্নামেন্ট বিজয় হিসেবে দেখি না। এ জয় মৌলবাদ, কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে। এ জয় প্রান্তিক মানুষের। এ জয় অদম্য লড়াকু বাঙালি নারীর। ওরা ১১ জন যেন অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। যখন নারী কী পোশাক পরবে তা নিয়ে নিদ্রাহীন কিছু মানুষ। পোশাকের জন্য নারী হেনস্তা হচ্ছে। যে সময় বিষণ্নতায় কিশোরী-তরুণীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এ যুগেও নারীর পথচলা নতুন করে দুর্গম হচ্ছে, তখন সাবিনা, রুপনা চাকমা, মারিয়া মান্ডা, কৃষ্ণা রানী সরকার যেন একেকটা আলোকবর্তিকা। তারা যেন মশাল জ্বালিয়ে পথ দেখালেন বাংলাদেশের সব নারীকে। ফাইনালের আগের দিন সানজিদা আক্তার তার ফেসবুকে লিখেছিলেন- ‘ফাইনালে আমরা একজন ফুটবলারের চরিত্রে মাঠে লড়ব এমন নয়, এগারোজন যোদ্ধাদল মাঠে থাকব। যে দলের অনেকে এগিয়ে এসেছে বাবাকে হারিয়ে, মায়ের শেষ সম্বল নিয়ে, বোনের অলংকার বিক্রি করে, অনেকে পরিবারের একমাত্র অবলম্বন হয়ে। আমরা জীবনযুদ্ধে লড়ে অভ্যস্ত।’ এ নারী দলের কারা কীভাবে সংগ্রাম করে এসেছেন তা আমাদের গণমাধ্যমের কল্যাণে এখন সবার জানা। এ নারীরা কী অসাধ্য সাধন করেছেন, কী প্রবল প্রতিপক্ষকে উপেক্ষা করে তারা খেলায় টিকেছেন তা এখন আমরা সবাই মোটামুটি জানি। কলসিন্দুর গ্রামের গল্প, সাতক্ষীরায় সাবিনার যুদ্ধ। রক্ষণশীলদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রংপুরের পালিচড়ার রামজীবন গ্রামের মৌসুমীর সংগ্রামের কাহিনি এখন আমরা জানি। কলসিন্দুরের মফিজ স্যার, রংপুরের কোচ মিলন, রাঙামাটির শান্তিমণি চাকমা ও বীর সেনদের মতো উজাড় করা প্রশিক্ষকদের অবদানের কথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চর্চা হচ্ছে। ‘মেয়েদের কোচ’ এ পরিচয়ে লজ্জা না পেয়ে গোলাম রব্বানী ছোটন যেন পিতার মতো তাদের বড় করেছেন।

১৯ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের সব গণমাধ্যমেই এ নিয়ে নানা লেখা-ফিচার পড়ে মুগ্ধ হচ্ছি। আবেগাপ্লুত হচ্ছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বেশির ভাগ গণমাধ্যমই নারী ফুটবলের উত্থানের নেপথ্যের মানুষটিকে উহ্য রেখেছে। তাঁর নাম আলোচনায়ই নেই। অথচ তিনি না থাকলে আমাদের নারীরা আদৌ ফুটবল খেলতে পারতেন কি না আমার সন্দেহ। তিনি হলেন শেখ হাসিনা। নারী ফুটবল বিকাশে সবচেয়ে যাঁর অবদান তাঁর নাম নিতে কেন আমাদের এত আড়ষ্টতা?

কলসিন্দুরের মেয়ে মারিয়া মান্ডার কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমরা আনন্দ করার জন্য ফুটবল খেলতাম। প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর মায়ের নামে প্রাইমারি স্কুল ফুটবল শুরু না করতেন তাহলে আমরা এ পর্যন্ত আসতে পারতাম না। তখন জানতাম না ফুটবল খেললে টাকা পাওয়া যায়। বিদেশে যাওয়া যায়। এখন বুঝি ফুটবলের মূল্য। অনেকের টাকা আছে কিন্তু বিদেশে সবার যাওয়া হয় না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কজনের হয়। আমরা তাঁর সঙ্গে কয়েকবার দেখা করেছি। আমাদের টাকা দিয়েছেন। আদর করেছেন।’ মারিয়া মান্ডার বক্তব্য থেকেই জানা যায় বাংলাদেশে নারী ফুটবলের উত্থানের নেপথ্যচারিণী কে। তাঁর নাম শেখ হাসিনা। তাঁর উৎসাহে-পৃষ্ঠপোষকতায় নারীরা আজ দেশের জন্য এ সম্মান বয়ে এনেছেন। আমাদের অদম্য মেয়েদের পথ তৈরি করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমাদের রাজনীতিবিদদের অদ্ভুত এক ব্যাধি আছে। কোনো অর্জন হলে তাতে তাঁর দলের হিস্সা খোঁজা। সব কৃতিত্ব একা নিয়ে নিতে চায়। একটা সুখস্মৃতিকে আমার-আমার বলে কাদায় লেপ্টে দেয়। এই যেমন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের নারী দল সাফজয় করে দেশে ফিরল। তাদের ‘খোলা বাসে’ রাজকীয় অভ্যর্থনা দেওয়া হলো। এ সময় মির্জা ফখরুল হঠাৎ এক নতুন তথ্য আবিষ্কার করলেন। তিনি বুধবার বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সাফ গেমস নারী ফুটবল খেলা চালু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।’ ফখরুল বললেন, ‘আমি পত্রিকায় দেখলাম ডানা (কামরুন নাহার ডানা), যিনি মহিলা ফেডারেশনের একসময় প্রধান ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম টুর্নামেন্টটা বেগম জিয়ার সরকারের সময় অনেক বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে শুরু হয়।’ পাঠক লক্ষ্য করুন, সাফ নারী ফুটবল যদি জিয়া শুরু করেন (যিনি ১৯৮১-তে ইন্তেকাল করেছেন) তাহলে ১৯৯১ সালে কিংবা ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া কীভাবে প্রথম টুর্নামেন্ট চালু করলেন? রাজনীতিবিদরা এ রকম গোঁজামিলে বক্তব্য দেন। এজন্য সাধারণ মানুষ তাঁদের কথাকে স্রেফ বিনোদন মনে করেন। আমাদের রাজনীতিবিদরা কি তাহলে ক্রমে কৌতুকাভিনেতায় পরিণত হচ্ছেন? বিএনপি মহাসচিব ইদানীং নানা তথ্য আবিষ্কারের জন্য আলোচিত। তাঁর কথায় বেগম জিয়া পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। বেগম জিয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, কিংবা খালেদা জিয়ার মানবাধিকার পদক- সবই রাজনীতিতে ব্যাপক কৌতুক জন্ম দেয়। তবে সাফ নারী ফুটবলের জনক জিয়া, এ তথ্য বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব কৌতুক ভাণ্ডারে খুব শিগগিরই স্থান পাবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ নারীদের বিশ্বকাপ প্রথম শুরু হয় জিয়ার মৃত্যুর ১০ বছর পর ১৯৯১ সালে। চীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নারী বিশ্বকাপে অংশ নেয় মাত্র ১২টি দেশ। এশিয়ার মাত্র তিনটি দেশের নারীরা ওই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল। দেশগুলো হলো- চীন, জাপান ও চাইনিজ তাইপে। শুধু তাই নয়, ১৯৮৬ সালের আগে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা তাদের সভায় নারীদের কথা বলারও সুযোগ দিত না। এই যখন বিশ্বে নারী ফুটবলের ইতিহাস, তখন মির্জা ফখরুলের ‘জিয়া সাফ নারী ফুটবলের প্রবর্তক’- এ বক্তব্যে দমফাটা হাসি না ডুকরে কান্না করা উচিত, তা নিয়ে আপনার বিভ্রম হতেই পারে। মূলত ১৯৯১ সালে নারী বিশ্বকাপের পরই ফিফা নারী ফুটবলের বিশ্বায়নের অভিযাত্রা শুরু করে। একপর্যায়ে ফিফা তার সদস্যদের জন্য নারী ফুটবল চালু বাধ্যতামূলক করে। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন নড়েচড়ে বসে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কামরুন নাহার ডানাকে উদ্ধৃত করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা-ও এক ধরনের তথ্য বিকৃতি। ২০০৩ সালে বাফুফে একাদশ নামে একটি নারী দল গঠন করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটি দল আনা হয় প্রীতি ম্যাচ খেলার জন্য। কিন্তু বিএনপির প্রধান শরিক জামায়াত এবং আরও মৌলবাদী সংগঠন এ খেলার বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। এমনকি তারা স্টেডিয়াম ঘেরাও পর্যন্ত করে। ফলে তিন ম্যাচের মধ্যে একটি মাঠে গড়ায়। ধর্মান্ধ, মৌলবাদীদের কাছে আত্মসর্মপণ করে বেগম জিয়ার সরকার। বাকি দুটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়। এ যেন শুরু না হতেই শেষ হওয়ার গল্প। নারী ফুটবল নিয়ে কীভাবে এগোবে সরকার? যুদ্ধাপরাধী, মৌলবাদীদের শীর্ষ দুই নেতাই তো তখন মন্ত্রী। এরপর নারী ফুটবল বাক্সবন্দি হয়ে যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কত রুপনা চাকমা, শিউলি, শামসুন্নাহার যে কত কষ্ট বুকে নিয়ে ফুটবল ছেড়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন কে জানে?

ফখরুল যদি বেসামাল কথা বলেন, তখন ক্ষমতাসীন দলের কেউ বেসামাল আচরণ করবে না, তা কী করে হয়। বিমানবন্দরে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নারী ফুটবল দলকে বরণ করে নিল। এরপর ‘ছাদখোলা বাসে’ শোভাযাত্রা। কিন্তু বাফুফেতে যাওয়ার পর ঘটল বীভৎস কাণ্ড। যারা বিজয় আনল তাদের ঠেলে দিয়ে আসন দখল করে নিলেন প্রতিমন্ত্রী, সচিব আর বাফুফে সভাপতি। মনে হলো এরাই নেপালে দশরথ রঙ্গশালায় খেলে এলেন। সাবিনা চিঁড়ে চ্যাপ্টা হয়ে এক কোনায়, ছোটন তো যেন বাইরের দর্শক। ক্ষমতায় থাকলে যে কিছু মানুষের কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায় বাফুফেতে সংবাদ সম্মেলন তা আরেকবার প্রমাণ করল। এ কর্তাব্যক্তিরা শুধু কাণ্ডজ্ঞানহীন নন, ন্যূনতম বোধশক্তিহীন। এ অবুঝ নাদানদের কে বোঝাবে এ অর্জন তাঁদের নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়, বাংলাদেশের। এটা শেখ হাসিনার চরম শত্রুরাও স্বীকার করবেন, তিনি ক্রীড়া-অন্তঃপ্রাণ। যেখানেই বাংলাদেশ যে খেলাই খেলেছে, সেখানেই প্রধানমন্ত্রীর সুভাশিস পৌঁছে গেছে। এমনকি এখন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়েও তিনি সাবিনা, রুপনাদের খোঁজ নিয়েছেন বরাবর। ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ক্রীড়াঙ্গনেও উন্নতির উদ্যোগ নেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ নারী ফুটবল যুগের সূচনা হয় আসলে ২০০৯ সালেই। তখনো মৌলবাদীদের আস্ফালন ছিল, হুমকি ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা এসব হুমকি-ধমকি প্রশ্রয় দেননি। উল্টো ২০১০ সালে কক্সবাজারে সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজক হয় বাংলাদেশ। ওই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ নারী দল ভুটানকে ২-০ গোলে, শ্রীলঙ্কাকে ৯-০ গোলে পরাজিত করে। সেমিফাইনালে নেপালের কাছে হেরে যায়। এরপর ২০১১ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালু হয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা গোল্ডকাপ। স্কুল পর্যায়ে দেশব্যাপী এ টুর্নামেন্টই আসলে নারী ফুটবলের জাগরণের সূচনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসেন আজকের বিজয়ী সাবিনারা। ভালো খেলে একের পর চমক দেখান বাংলার অদম্য মেয়েরা। আর এ জাগরণে নেপথ্য থেকে অফুরান সহযোগিতা করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। এএফসি-১৫, সাফ অনূর্ধ্ব-১৫সহ যখন যেখানে বাংলাদেশের মেয়েরা জিতেছেন তখনই তাদের আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন। নারী দলের প্রত্যেক সদস্যকে বিভিন্ন সময় ১ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অনেক পণ্ডিত দেখি বলেন, আর্থিক অনুদান ভালো নয়। এতে ক্রীড়াবিদদের পদস্খলন হয়। ক্রিকেটের উদাহরণ দিয়ে কেউ কেউ দেখলাম বলার চেষ্টা করছেন ‘এ মেয়েগুলো টাকা পেলে খেলায় মনোযোগ দেবে না।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ঠিকই জানেন দারিদ্র্যের সঙ্গে কঠিন লড়াই করে এরা ফুটবল খেলছেন। অর্থনৈতিক শক্তি না থাকলে এরা এগোতে পারবে না। নারী স্বাধীনতার জন্য চাই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পুরস্কারের অর্থের সুবাদে এরা শক্তি পেয়েছেন, সাহস পেয়েছেন। পরিবার এদের জেদ মেনে নিয়েছে। শুধু আর্থিক অনুদান নয়, রুপনা চাকমার মতো অনেক নারী ফুটবলারকে শেখ হাসিনা জমি দিয়েছেন। দিয়েছেন ঘর উপহার। এর ফলে হতদরিদ্র বাবা-মারা সমাজকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস পেয়েছেন। মেয়ের ইচ্ছার মূল্য দিয়েছেন। কিন্তু শুধু উপহার এবং অনুদান দিয়ে তো প্রতিদিনের জীবন চলে না। এজন্য দরকার আর্থিক নিশ্চয়তা। খেলাকে পেশা হিসেবে না নিয়ে সাবিনা, স্বপ্না, মনিকাদের মধ্যে হতাশা নেমে আসবে। নতুন রুপনা, শিউলি, মাসুরারা আসবে না। এ ক্ষেত্রে এক অসাধারণ উদ্যোগ নেয় দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ বসুন্ধরা। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং উৎসাহে বসুন্ধরা নারী ফুটবল দল গঠিত হয়। এবার সাফজয়ী নারী দলের প্রথম একাদশের আটজনই বসুন্ধরা কিংসের হয়ে ঘরোয়া লিগে খেলেন। বসুন্ধরা গ্রুপ এই নারীদের অনিশ্চয়তার আতঙ্ক থেকে মুক্তি দিয়েছে। আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সুযোগ-সুবিধা দিয়ে স্বপ্নের সীমানা অনেক বড় করে দিয়েছে। নারী ফুটবলের এ জাগরণে এ বৃহৎ শিল্প পরিবারের অবদান বিরাট। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত নারী ফুটবলকে একটা কাঠামো দিয়েছে। একটা রূপকল্প দিয়েছে। স্কুল ফুটবল, ঘরোয়া লিগ, জাতীয় দল এ বিন্যাস নারী দলকে এগিয়ে দিচ্ছে। একজন কিশোরী এখন জানে, এটি শুধু তার শখ কিংবা নেশা নয়। তার পেশা। এ পেশায় অর্থ, সম্মান দুই-ই আছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এ দেশের নারী ক্রিকেট এগিয়ে যাবে আরও বহুদূর।

কিন্তু সাবিনা, কৃষ্ণা কিংবা মারিয়া মান্ডাদের এ জয়কে আমি শুধু একটা ট্রফি জয়ের আনন্দের মধ্যে বন্দি করে রাখতে চাই না। এটি কেবল একটি খেলার উৎকর্ষতা নয়। এ জয়ের বহুমাত্রিক তাৎপর্য আছে। বাংলাদেশ নারী দলের খেলোয়াড়দের দেখুন। যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। এখানে সব ধর্মের মানুষের সম্মিলন ঘটেছে। সমতলের আদিবাসী, পাহাড়ি আদিবাসী, বাঙালি। সবাই মিলে একটি দল। যেমন সবাই মিলে এই বাংলাদেশ। এ তরুণ প্রাণ সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মেয়েরা কীভাবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের ভেদাভেদ উপড়ে ফেলেছেন। এ রকম একটি বাংলাদেশের স্বপ্নই তো আমরা দেখেছিলাম একাত্তরে। আমাদের স্বাধীনতার স্লোগান ছিল- ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান- আমরা সবাই বাঙালি’। সেই স্লোগানে এ নিপুণ চিত্ররূপ যেন মারিয়া মান্ডা, কৃষ্ণা আর সাবিনাদের দলটি। যখন ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের হিংস্র নখ আবার বেরিয়ে এসেছে, যখন ধর্মীয় উৎসবের আগে আতঙ্কের প্রহর গোনে আমাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তখন সম্প্রীতির বাংলাদেশের এক চিলতে উঠোন যেন আমাদের নারী ফুটবল দল।

সাবিনাদের আরেকটি ব্যাপার আমাকে মুগ্ধ করেছে। এরা সবাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। বাংলার গ্রামগঞ্জ থেকে উঠে এসেছেন এ অদম্য মেয়েরা। খুব সাধারণ বাঙালি পরিবার। এদের কারও বাবা দিনমজুর, কেউ কৃষক, কেউ ক্ষুদ্র বিক্রেতা, কেউ শ্রমিক, কেউ রাজমিস্ত্রি। এ সাধারণের শক্তি যে কত অপরাজেয় তা বোঝা গেল আরেকবার। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যেমন মুটে, মজুর, শ্রমিক, কৃষকের সম্মিলিত বিজয়গাথা। এদের বিজয়টাও তেমনি। এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই আমাদের শক্তি। কলসিন্দুর, রংপুর, সাতক্ষীরা, রাঙামাটির প্রত্যন্ত জনপদই আমাদের বাংলাদেশ। এ প্রান্তিক মানুষই দেশটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এ মেয়েরা স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটেছেন। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এ পর্যন্ত এসেছেন। সমাজের তথাকথিত শৃঙ্খলা এরা উপেক্ষা করেছেন। মানুষের কটূক্তি-উপহাস এরা পাত্তা দেননি। এদের লক্ষ্য ছিল অবিচল। এ মেয়েরা আমাদের সবাইকে বিশেষ করে নারীদের এক বড় শিক্ষা দিলেন। বাধা অতিক্রম করতে হবে। প্রতিকূলতা জয় করেই বিজয় ছিনিয়ে আনতে হয়। কঠিন পরিশ্রম এবং অবিচলে এগিয়ে গেলে লক্ষ্য অর্জিত হবেই। এ শিক্ষাটা কৃষ্ণা, রুপনা, স্বপ্নারা নতুন করে শেখালেন। একটু হতাশায় আত্মহত্যা নয়; খানিকটা ব্যর্থতায় বিষণ্ন্নতা নয়; কঠিন তিরস্কার কিংবা অবহেলায় আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া নয় বরং এসব পরাজিত করার নামই জীবন। সানজিদা, শিউলি, মনিকারা অভিভাবকদের জন্যও একটা বার্তা দিয়ে গেলেন- আমার মেয়ে পড়তে চায়, তাকে পড়তে দেব। আমার মেয়ে আকাশ স্পর্শ করতে চায়, আমি সায় দেব। আমার মেয়ে গান গাইতে চায়, গান গাইতে দেব। বারবার প্রতিনিয়ত তাকে বলব না, ‘তুমি মেয়ে। তোমাকে সংসার করতে হবে। স্বামীর জন্য রান্না শিখতে হবে। স্বামীর জামা-জুতা সাফ করতে হবে। ইচ্ছা করুক না করুক স্বামীর সঙ্গে শুতে হবে। তাকে সুখ দিতে হবে। তোমার ইচ্ছাটা মুখ্য নয়। তুমি স্বামীর জন্য উৎসর্গীকৃত এক প্রাণ। এটাই তোমার গন্তব্য।’ যেসব বাবা-মা তাঁদের মেয়েসন্তানদের এ শিক্ষায় গড়ে তুলতে চান, একজন ‘স্বামীর সেবক’ বানাতে চান- শিউলি, সাথী, রিতু তার এক মোক্ষম জবাব। আসুন না আমরা মারিয়া, রুপনা, মনিকাদের বাবা-মায়ের মতো উদার হই। আমাদের মেয়েদের জীবনকে দিই পূর্ণতা। এ জয় সবাইকে এ বার্তাটাও দিয়ে গেল। এ মেয়েদের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে আমি অদ্ভুত মিল পেয়েছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনের। এরা যেন লক্ষ্য স্থির করে বিপরীত স্রোতে সাঁতার কেটে পৌঁছেছে সোনালি বন্দরে। শেখ হাসিনার জীবনটাও তেমনি। এরা যেমন অসম্ভব শব্দটা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যাও তেমন। এরা যেমন অবহেলা, বঞ্চনায় হতোদ্যম হননি। তেমনি গল্প শেখ হাসিনারও। বুধবার শুনলাম এ মেয়েরা বারবার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। এদের সবাইকে বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রী গণভবনে ডেকে নিয়ে গেছেন। আদর করেছেন। হয়তো তাঁর সাহস, মনোবল সঞ্চারিত করেছেন এ কিশোরীদের মধ্যে। কী অদ্ভুত! এ সেপ্টেম্বরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। ২৮ সেপ্টেম্বর। জন্মদিনের আগে তাঁর প্রেরণায় অদম্য হয়ে ওঠা মেয়েরা যেন এক বিজয় পালক তুলে দিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যাকে। শেখ হাসিনা যেমন তাঁর সব অর্জন এ দেশের জনগণের জন্য উৎসর্গ করেন। অপরাজিতরাও তাঁদের বিজয় উৎসর্গ করলেন দেশবাসীকে। শেখ হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছেন এ আলোর পথযাত্রীরা। যে পথের গন্তব্য হলো নারী মুক্তির বাংলাদেশ।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

মারিয়া   কৃষ্ণা   সাবিনা   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

বিএনপির কোটি টাকার যুক্তরাষ্ট্র মিশন: ব্যর্থ হলো যেভাবে

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail বিএনপির কোটি টাকার যুক্তরাষ্ট্র মিশন: ব্যর্থ হলো যেভাবে

দেশে রাজপথে আন্দোলন করছে বিএনপি। সামনে আন্দোলন আরও বেগবান করবে এমন কথা বিএনপি নেতারা সুস্পষ্টভাবে বলছে। এমনকি কর্মীদেরকে লাঠিসোটা নিয়ে সমাবেশে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি বিএনপি নেতৃবৃন্দ এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দূতাবাসে গিয়ে বৈঠক করছে, সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ করছে এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি বাস্তবায়নের জন্য তাদের কাছে নানা রকম যুক্তি তুলে ধরেছে। এটুকুই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্ট এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিষেদাগার করার জন্য বিএনপি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে সেটিও বিএনপি এবং জামায়াত গোষ্ঠীর অপপ্রচারের ফল বলেও বিভিন্ন মহল মনে করে। গত কয়েক বছর ধরেই বিএনপির লবিস্ট ফার্ম এবং যুদ্ধাপরাধীদের একটি সক্রিয় গ্রুপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা রকম অপপ্রচার করছে। এই সমস্ত অপপ্রচারের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা নিচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। পাশাপাশি জাতিসংঘেও এই ধরণের অসত্য তথ্যগুলো সরবরাহ করা হয়েছে, যার প্রমাণ পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক সময়। এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরেও বিএনপি ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। বিএনপি এইজন্য কয়েক কোটি টাকা খরচ করেছিলো বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত করে। বিএনপির মূল পরিকল্পনা ছিল তিনটি।

প্রথমত, প্রধানমন্ত্রীর সফরে বিক্ষোভ মিছিল ইত্যাদি করে একটি দৃশ্যমান অনাস্থা দেখানো হবে যাতে আন্তর্জাতিক মহলে একটি বার্তা যায় যে, বর্তমান সরকারের ওপর প্রবাসীদের আস্থা নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সফরে তেমন কিছু সম্ভব হয়নি। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখানে ভালো শোডাউন করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়েছে।

বিএনপি-জামায়াতের দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছিল যে, জো বাইডেনের সঙ্গে যেন প্রধানমন্ত্রীর কোনো সাক্ষাৎ না হয়। এইজন্য বিএনপি একটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছিলো। প্রতিবার নিউ ইয়র্কে যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন হয় তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরকার এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে মিলিত হন এবং তাদেরকে সংবর্ধনা দেন। যতবার প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের অধিবেদনে যোগ দিতে গেছেন ততবারই তিনি এই সংবর্ধনায় দাওয়াত পেয়েছেন। এবার যেন প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত না দেওয়া হয়, সেজন্য বিএনপির লবিস্ট ফার্মরা খুব সক্রিয় ছিল। যেভাবে বাংলাদেশকে ‘গণতন্ত্র সম্মেলনে’ আমন্ত্রণ জানানো হয়নি সেভাবেই যেন শেখ হাসিনাকে এই সংবর্ধনায় দাওয়াত না দেওয়া হয় সেজন্য চেষ্টার কম করা হয়নি, কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে যেন দাওয়াত না দেওয়া হয় তার পেছনে যুক্তি হিসেবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচন ইত্যাদি প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিলো। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর লবিস্ট ফার্মের এই আবদার গ্রহণ করেনি। বরং হোয়াইট হাউজ জানিয়ে দেয়, শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতে জো বাইডেন আগ্রহী। আর এ কারণেই শেষ পর্যন্ত বিএনপির কোটি টাকার যুক্তরাষ্ট্র মিশন ব্যর্থ হয়ে গেল।

যুক্তরাষ্ট্র ষড়যন্ত্রে বিএনপির যে তৃতীয় ধাপ সেটি হলো, আজ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ দিবেন, সেই ভাষণের সময় বিক্ষোভ প্রদর্শন করা বা বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা। কিন্তু সেটিও সফল হচ্ছে না বলে বিভিন্ন সূত্র বাংলা ইনসাইডারকে নিশ্চিত করেছে।

বিএনপি  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

শেখ হাসিনাকে কি বার্তা দিলেন বাইডেন?

প্রকাশ: ০৮:০১ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail শেখ হাসিনাকে কি বার্তা দিলেন বাইডেন?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে অবস্থান করছেন। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা। এর মধ্যে গত বুধবার ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে তিনি যোগদান করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য নিউ ইয়র্কে আসা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তার পত্নী আমেরিকার মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল লটেতে প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একেএম আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, বাইডেন এবং তাঁর পত্নী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এসময় উভয় নেতা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে সে ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে বাইডেনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাইডেন কি বার্তা দিলেন, সেটি রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার সঙ্গে বাইডেনের আলাপে কোন বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই বলা হয়নি। তবে এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর যোগদান বাইডেনের সঙ্গে তার আলাপ রাজনীতিতে তাৎপর্য এবং গুরুত্ব বহন করে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জো বাইডেনের গ্রহণযোগ্যতা পেল বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর মাধ্যমে আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হলো যে, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখনো তলানিতে যেয়ে ঠেকেনি। দুই দেশই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী। এরকম পরিস্থিতি না হলে বাইডেনের এই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা হয়তো আমন্ত্রণ পেতেন না।

গত কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে নানারকম টানাপোড়নের কথা শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে বেশকিছু স্পর্শকাতর ইস্যু সামনে চলে এসেছে। জো বাইডেন গত বছর যে গণতন্ত্র সম্মেলন ডেকেছিলেন সেই সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানায়নি। এই আমন্ত্রণ না জানানো নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমন্ত্রণ না জানানোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা নতুন ডং। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এছাড়াও র‍্যাবের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি মনগড়া ভিত্তিহীন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই রিপোর্টের ব্যাপারেও বাংলাদেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। দু'দেশের সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি উচ্চপর্যায়ের দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সেখানে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ব্লিঙ্কেনে সঙ্গেও বৈঠক করেন। এই সমস্ত বৈঠকে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও তেমন সাড়া দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এরকম একটি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং জো বাইডেনের আমন্ত্রণের যাওয়াটা একটি বড় মেরুকরণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, বাইডেন এবং শেখ হাসিনার মধ্যে যে আলোচনায় হোক না কেন, এর মাধ্যমে বাইডেন একটি বার্তা সুস্পষ্ট করলো। তা হলো আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি জো বাইডেনের আলাদা কোনো নেতিবাচক মনোভাব নেই। তবে বিভিন্ন কূটনৈতিক মহল বলছে, এই সমস্ত আলোচনা হয় স্রেফ সৌজন্যমূলক। এ ধরনের আলোচনা দেশের অভ্যন্তরীণ জটিল রাজনৈতিক ইস্যু বা অন্যান্য ইস্যু প্রাধান্য পায়না।


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন