এডিটর’স মাইন্ড

ড. ইউনূসের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীলনকশা?

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail ড. ইউনূসের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীলনকশা?

রাজনীতিতে ক্রমশ উত্তাপ-উত্তেজনা বাড়ছে, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। এই সহিংসতার মাঝেই সুশীল সমাজ তার নীলনকশা বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রাজপথের সংঘাত-সহিংসতা যদি তীব্র হয় তাহলে সুশীল সমাজের ক্ষমতা আহরণের পথ পরিষ্কার হবে বলে অনেকে ধারণা করছে। ইতিমধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া আগামী নির্বাচনে তারা অংশ গ্রহণ করবে না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে হবে, কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবে, কতদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে ইত্যাদি নিয়ে পর্দার আড়ালে নানারকম খেলা চলছে। আরেকটি ওয়ান-ইলেভেনের ফর্মুলা মাথায় রেখেই সুশীল সমাজের কিছু কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করছেন। আর এই সমস্ত মেরুকরণের মূল কুশীলব হলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

ইউনূস এখন প্রতারণা, জালিয়াতি এবং অর্থপাচারসহ নানা মামলার চাপে রয়েছেন। আর এই চাপ সরাতে তিনি সরকার উৎখাতেরই একটি ষড়যন্ত্র করছেন এবং সেই ষড়যন্ত্রে সুশীলরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিতে চাইছে বলেও একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে যে, গত কয়েকদিনের সুশীলদের সঙ্গে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাম দলগুলোসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের কথা হয়েছে। তারা বলছেন যে, বর্তমান যে সংবিধান রয়েছে সেই সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা অসম্ভব ব্যাপার। তাছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অতীতের যে কার্যক্রম (২০০৭ সাল বাদ দিলে) তাতে দেখা যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। এজন্য সুশীল সমাজ আবার এক-এগারোর মত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামছে। বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে যে, বিএনপির সঙ্গে এবং জাতীয় পার্টির সঙ্গে বৈঠকে সুশীলরা একটি আপদকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ফর্মুলা হাজির করেছে। এই ফর্মুলায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়েছে। এখনই নির্বাচন নয় বরং আগে সংবিধান সংশোধন, তারপর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ এবং সকলের মতামতের ভিত্তিতে একটি নতুন নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং নতুন সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর নির্বাচনের বিষয়টি এখন সুশীলদের পরিকল্পনা।

সুশীলরা বলছেন যে, যেহেতু সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে এখন নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো পন্থায় ক্ষমতা গ্রহণকে তাড়িত করা হয়েছে সেই জন্যই ক্ষমতা গ্রহণের আগে দরকার সরকারের পতন। সরকারের পতনের জন্য তারা মনে করছে একটি সহিংস পরিস্থিতি দেশের তৈরি করতে হবে। এই কারণে বিএনপিকে তারা আরও আগ্রাসী এবং উস্কানিমূলক ভূমিকা গ্রহণের জন্য একাধিকবার অনুরোধ করেছে। মূল পরিকল্পনায় রয়েছে যে, যদি আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে সেক্ষেত্রে সংবিধান স্থগিত করে একটি অরাজনৈতিক সরকার গঠিত হবে যে সরকারকে নেতৃত্ব দিবেন ইউনূস। পাশাপাশি এই সরকারকে বৈধতা দেওয়ার জন্য দেশে একটি গণভোট আয়োজন করা হবে। অতীতেও জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ একই পদ্ধতিতে গিয়েছিলেন। তারা প্রহসনের গণভোট করে তাদের ক্ষমতাকে জায়েজ করেছিলেন। সুশীল সমাজের পরিকল্পনা অনুযায়ী গণভোটের মাধ্যমে ড. ইউনূসের সরকারকে বৈধতা দেওয়ার পর তারা একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি করবে এবং সেই সংবিধান প্রণয়ন কমিটিতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ছাড়াও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাদের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হবে এবং নির্বাচন ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। তারপর নির্বাচন হবে। অর্থাৎ তিন থেকে পাঁচ বছরের মেয়েদের পরিকল্পনা নিয়ে সুশীল সমাজ এগুচ্ছে। আর এ কারণেই বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলে গলা ফাটানো এখন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কি রকম হবে তা ঘোষণা করেনি।

ড. ইউনূস  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মারিয়া কৃষ্ণা সাবিনা এবং একজন শেখ হাসিনা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail মারিয়া কৃষ্ণা সাবিনা এবং একজন শেখ হাসিনা

কৃষ্ণা রানী সরকার যখন কোনাকুনি শটে নেপালের জালে তৃতীয় গোলটি দিল তখন আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আবেগ ধরে রাখতে পারিনি, অনুমান করি আমার মতো অনেকেই ১৯ সেপ্টেম্বর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশে এখন নানা শঙ্কা, অনিশ্চয়তা, হতাশা। ব্যর্থতার চোরাবালিতে আটকে গেছে আমাদের প্রিয় ক্রিকেট। এর মধ্যে আমাদের মেয়েদের এ অসাধারণ সাফল্য যেন তীব্র দাবদাহে এক পশলা বৃষ্টি। এ সাফল্য কেবল সাফজয় নয়। আমি এটাকে কেবল একটি টুর্নামেন্ট বিজয় হিসেবে দেখি না। এ জয় মৌলবাদ, কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে। এ জয় প্রান্তিক মানুষের। এ জয় অদম্য লড়াকু বাঙালি নারীর। ওরা ১১ জন যেন অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। যখন নারী কী পোশাক পরবে তা নিয়ে নিদ্রাহীন কিছু মানুষ। পোশাকের জন্য নারী হেনস্তা হচ্ছে। যে সময় বিষণ্নতায় কিশোরী-তরুণীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এ যুগেও নারীর পথচলা নতুন করে দুর্গম হচ্ছে, তখন সাবিনা, রুপনা চাকমা, মারিয়া মান্ডা, কৃষ্ণা রানী সরকার যেন একেকটা আলোকবর্তিকা। তারা যেন মশাল জ্বালিয়ে পথ দেখালেন বাংলাদেশের সব নারীকে। ফাইনালের আগের দিন সানজিদা আক্তার তার ফেসবুকে লিখেছিলেন- ‘ফাইনালে আমরা একজন ফুটবলারের চরিত্রে মাঠে লড়ব এমন নয়, এগারোজন যোদ্ধাদল মাঠে থাকব। যে দলের অনেকে এগিয়ে এসেছে বাবাকে হারিয়ে, মায়ের শেষ সম্বল নিয়ে, বোনের অলংকার বিক্রি করে, অনেকে পরিবারের একমাত্র অবলম্বন হয়ে। আমরা জীবনযুদ্ধে লড়ে অভ্যস্ত।’ এ নারী দলের কারা কীভাবে সংগ্রাম করে এসেছেন তা আমাদের গণমাধ্যমের কল্যাণে এখন সবার জানা। এ নারীরা কী অসাধ্য সাধন করেছেন, কী প্রবল প্রতিপক্ষকে উপেক্ষা করে তারা খেলায় টিকেছেন তা এখন আমরা সবাই মোটামুটি জানি। কলসিন্দুর গ্রামের গল্প, সাতক্ষীরায় সাবিনার যুদ্ধ। রক্ষণশীলদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রংপুরের পালিচড়ার রামজীবন গ্রামের মৌসুমীর সংগ্রামের কাহিনি এখন আমরা জানি। কলসিন্দুরের মফিজ স্যার, রংপুরের কোচ মিলন, রাঙামাটির শান্তিমণি চাকমা ও বীর সেনদের মতো উজাড় করা প্রশিক্ষকদের অবদানের কথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চর্চা হচ্ছে। ‘মেয়েদের কোচ’ এ পরিচয়ে লজ্জা না পেয়ে গোলাম রব্বানী ছোটন যেন পিতার মতো তাদের বড় করেছেন।

১৯ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের সব গণমাধ্যমেই এ নিয়ে নানা লেখা-ফিচার পড়ে মুগ্ধ হচ্ছি। আবেগাপ্লুত হচ্ছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বেশির ভাগ গণমাধ্যমই নারী ফুটবলের উত্থানের নেপথ্যের মানুষটিকে উহ্য রেখেছে। তাঁর নাম আলোচনায়ই নেই। অথচ তিনি না থাকলে আমাদের নারীরা আদৌ ফুটবল খেলতে পারতেন কি না আমার সন্দেহ। তিনি হলেন শেখ হাসিনা। নারী ফুটবল বিকাশে সবচেয়ে যাঁর অবদান তাঁর নাম নিতে কেন আমাদের এত আড়ষ্টতা?

কলসিন্দুরের মেয়ে মারিয়া মান্ডার কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমরা আনন্দ করার জন্য ফুটবল খেলতাম। প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর মায়ের নামে প্রাইমারি স্কুল ফুটবল শুরু না করতেন তাহলে আমরা এ পর্যন্ত আসতে পারতাম না। তখন জানতাম না ফুটবল খেললে টাকা পাওয়া যায়। বিদেশে যাওয়া যায়। এখন বুঝি ফুটবলের মূল্য। অনেকের টাকা আছে কিন্তু বিদেশে সবার যাওয়া হয় না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কজনের হয়। আমরা তাঁর সঙ্গে কয়েকবার দেখা করেছি। আমাদের টাকা দিয়েছেন। আদর করেছেন।’ মারিয়া মান্ডার বক্তব্য থেকেই জানা যায় বাংলাদেশে নারী ফুটবলের উত্থানের নেপথ্যচারিণী কে। তাঁর নাম শেখ হাসিনা। তাঁর উৎসাহে-পৃষ্ঠপোষকতায় নারীরা আজ দেশের জন্য এ সম্মান বয়ে এনেছেন। আমাদের অদম্য মেয়েদের পথ তৈরি করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমাদের রাজনীতিবিদদের অদ্ভুত এক ব্যাধি আছে। কোনো অর্জন হলে তাতে তাঁর দলের হিস্সা খোঁজা। সব কৃতিত্ব একা নিয়ে নিতে চায়। একটা সুখস্মৃতিকে আমার-আমার বলে কাদায় লেপ্টে দেয়। এই যেমন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের নারী দল সাফজয় করে দেশে ফিরল। তাদের ‘খোলা বাসে’ রাজকীয় অভ্যর্থনা দেওয়া হলো। এ সময় মির্জা ফখরুল হঠাৎ এক নতুন তথ্য আবিষ্কার করলেন। তিনি বুধবার বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সাফ গেমস নারী ফুটবল খেলা চালু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।’ ফখরুল বললেন, ‘আমি পত্রিকায় দেখলাম ডানা (কামরুন নাহার ডানা), যিনি মহিলা ফেডারেশনের একসময় প্রধান ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম টুর্নামেন্টটা বেগম জিয়ার সরকারের সময় অনেক বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে শুরু হয়।’ পাঠক লক্ষ্য করুন, সাফ নারী ফুটবল যদি জিয়া শুরু করেন (যিনি ১৯৮১-তে ইন্তেকাল করেছেন) তাহলে ১৯৯১ সালে কিংবা ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া কীভাবে প্রথম টুর্নামেন্ট চালু করলেন? রাজনীতিবিদরা এ রকম গোঁজামিলে বক্তব্য দেন। এজন্য সাধারণ মানুষ তাঁদের কথাকে স্রেফ বিনোদন মনে করেন। আমাদের রাজনীতিবিদরা কি তাহলে ক্রমে কৌতুকাভিনেতায় পরিণত হচ্ছেন? বিএনপি মহাসচিব ইদানীং নানা তথ্য আবিষ্কারের জন্য আলোচিত। তাঁর কথায় বেগম জিয়া পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। বেগম জিয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, কিংবা খালেদা জিয়ার মানবাধিকার পদক- সবই রাজনীতিতে ব্যাপক কৌতুক জন্ম দেয়। তবে সাফ নারী ফুটবলের জনক জিয়া, এ তথ্য বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব কৌতুক ভাণ্ডারে খুব শিগগিরই স্থান পাবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ নারীদের বিশ্বকাপ প্রথম শুরু হয় জিয়ার মৃত্যুর ১০ বছর পর ১৯৯১ সালে। চীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নারী বিশ্বকাপে অংশ নেয় মাত্র ১২টি দেশ। এশিয়ার মাত্র তিনটি দেশের নারীরা ওই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল। দেশগুলো হলো- চীন, জাপান ও চাইনিজ তাইপে। শুধু তাই নয়, ১৯৮৬ সালের আগে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা তাদের সভায় নারীদের কথা বলারও সুযোগ দিত না। এই যখন বিশ্বে নারী ফুটবলের ইতিহাস, তখন মির্জা ফখরুলের ‘জিয়া সাফ নারী ফুটবলের প্রবর্তক’- এ বক্তব্যে দমফাটা হাসি না ডুকরে কান্না করা উচিত, তা নিয়ে আপনার বিভ্রম হতেই পারে। মূলত ১৯৯১ সালে নারী বিশ্বকাপের পরই ফিফা নারী ফুটবলের বিশ্বায়নের অভিযাত্রা শুরু করে। একপর্যায়ে ফিফা তার সদস্যদের জন্য নারী ফুটবল চালু বাধ্যতামূলক করে। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন নড়েচড়ে বসে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কামরুন নাহার ডানাকে উদ্ধৃত করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা-ও এক ধরনের তথ্য বিকৃতি। ২০০৩ সালে বাফুফে একাদশ নামে একটি নারী দল গঠন করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটি দল আনা হয় প্রীতি ম্যাচ খেলার জন্য। কিন্তু বিএনপির প্রধান শরিক জামায়াত এবং আরও মৌলবাদী সংগঠন এ খেলার বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। এমনকি তারা স্টেডিয়াম ঘেরাও পর্যন্ত করে। ফলে তিন ম্যাচের মধ্যে একটি মাঠে গড়ায়। ধর্মান্ধ, মৌলবাদীদের কাছে আত্মসর্মপণ করে বেগম জিয়ার সরকার। বাকি দুটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়। এ যেন শুরু না হতেই শেষ হওয়ার গল্প। নারী ফুটবল নিয়ে কীভাবে এগোবে সরকার? যুদ্ধাপরাধী, মৌলবাদীদের শীর্ষ দুই নেতাই তো তখন মন্ত্রী। এরপর নারী ফুটবল বাক্সবন্দি হয়ে যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কত রুপনা চাকমা, শিউলি, শামসুন্নাহার যে কত কষ্ট বুকে নিয়ে ফুটবল ছেড়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন কে জানে?

ফখরুল যদি বেসামাল কথা বলেন, তখন ক্ষমতাসীন দলের কেউ বেসামাল আচরণ করবে না, তা কী করে হয়। বিমানবন্দরে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নারী ফুটবল দলকে বরণ করে নিল। এরপর ‘ছাদখোলা বাসে’ শোভাযাত্রা। কিন্তু বাফুফেতে যাওয়ার পর ঘটল বীভৎস কাণ্ড। যারা বিজয় আনল তাদের ঠেলে দিয়ে আসন দখল করে নিলেন প্রতিমন্ত্রী, সচিব আর বাফুফে সভাপতি। মনে হলো এরাই নেপালে দশরথ রঙ্গশালায় খেলে এলেন। সাবিনা চিঁড়ে চ্যাপ্টা হয়ে এক কোনায়, ছোটন তো যেন বাইরের দর্শক। ক্ষমতায় থাকলে যে কিছু মানুষের কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায় বাফুফেতে সংবাদ সম্মেলন তা আরেকবার প্রমাণ করল। এ কর্তাব্যক্তিরা শুধু কাণ্ডজ্ঞানহীন নন, ন্যূনতম বোধশক্তিহীন। এ অবুঝ নাদানদের কে বোঝাবে এ অর্জন তাঁদের নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়, বাংলাদেশের। এটা শেখ হাসিনার চরম শত্রুরাও স্বীকার করবেন, তিনি ক্রীড়া-অন্তঃপ্রাণ। যেখানেই বাংলাদেশ যে খেলাই খেলেছে, সেখানেই প্রধানমন্ত্রীর সুভাশিস পৌঁছে গেছে। এমনকি এখন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়েও তিনি সাবিনা, রুপনাদের খোঁজ নিয়েছেন বরাবর। ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ক্রীড়াঙ্গনেও উন্নতির উদ্যোগ নেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ নারী ফুটবল যুগের সূচনা হয় আসলে ২০০৯ সালেই। তখনো মৌলবাদীদের আস্ফালন ছিল, হুমকি ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা এসব হুমকি-ধমকি প্রশ্রয় দেননি। উল্টো ২০১০ সালে কক্সবাজারে সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজক হয় বাংলাদেশ। ওই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ নারী দল ভুটানকে ২-০ গোলে, শ্রীলঙ্কাকে ৯-০ গোলে পরাজিত করে। সেমিফাইনালে নেপালের কাছে হেরে যায়। এরপর ২০১১ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালু হয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা গোল্ডকাপ। স্কুল পর্যায়ে দেশব্যাপী এ টুর্নামেন্টই আসলে নারী ফুটবলের জাগরণের সূচনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসেন আজকের বিজয়ী সাবিনারা। ভালো খেলে একের পর চমক দেখান বাংলার অদম্য মেয়েরা। আর এ জাগরণে নেপথ্য থেকে অফুরান সহযোগিতা করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। এএফসি-১৫, সাফ অনূর্ধ্ব-১৫সহ যখন যেখানে বাংলাদেশের মেয়েরা জিতেছেন তখনই তাদের আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন। নারী দলের প্রত্যেক সদস্যকে বিভিন্ন সময় ১ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অনেক পণ্ডিত দেখি বলেন, আর্থিক অনুদান ভালো নয়। এতে ক্রীড়াবিদদের পদস্খলন হয়। ক্রিকেটের উদাহরণ দিয়ে কেউ কেউ দেখলাম বলার চেষ্টা করছেন ‘এ মেয়েগুলো টাকা পেলে খেলায় মনোযোগ দেবে না।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ঠিকই জানেন দারিদ্র্যের সঙ্গে কঠিন লড়াই করে এরা ফুটবল খেলছেন। অর্থনৈতিক শক্তি না থাকলে এরা এগোতে পারবে না। নারী স্বাধীনতার জন্য চাই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পুরস্কারের অর্থের সুবাদে এরা শক্তি পেয়েছেন, সাহস পেয়েছেন। পরিবার এদের জেদ মেনে নিয়েছে। শুধু আর্থিক অনুদান নয়, রুপনা চাকমার মতো অনেক নারী ফুটবলারকে শেখ হাসিনা জমি দিয়েছেন। দিয়েছেন ঘর উপহার। এর ফলে হতদরিদ্র বাবা-মারা সমাজকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস পেয়েছেন। মেয়ের ইচ্ছার মূল্য দিয়েছেন। কিন্তু শুধু উপহার এবং অনুদান দিয়ে তো প্রতিদিনের জীবন চলে না। এজন্য দরকার আর্থিক নিশ্চয়তা। খেলাকে পেশা হিসেবে না নিয়ে সাবিনা, স্বপ্না, মনিকাদের মধ্যে হতাশা নেমে আসবে। নতুন রুপনা, শিউলি, মাসুরারা আসবে না। এ ক্ষেত্রে এক অসাধারণ উদ্যোগ নেয় দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ বসুন্ধরা। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং উৎসাহে বসুন্ধরা নারী ফুটবল দল গঠিত হয়। এবার সাফজয়ী নারী দলের প্রথম একাদশের আটজনই বসুন্ধরা কিংসের হয়ে ঘরোয়া লিগে খেলেন। বসুন্ধরা গ্রুপ এই নারীদের অনিশ্চয়তার আতঙ্ক থেকে মুক্তি দিয়েছে। আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সুযোগ-সুবিধা দিয়ে স্বপ্নের সীমানা অনেক বড় করে দিয়েছে। নারী ফুটবলের এ জাগরণে এ বৃহৎ শিল্প পরিবারের অবদান বিরাট। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত নারী ফুটবলকে একটা কাঠামো দিয়েছে। একটা রূপকল্প দিয়েছে। স্কুল ফুটবল, ঘরোয়া লিগ, জাতীয় দল এ বিন্যাস নারী দলকে এগিয়ে দিচ্ছে। একজন কিশোরী এখন জানে, এটি শুধু তার শখ কিংবা নেশা নয়। তার পেশা। এ পেশায় অর্থ, সম্মান দুই-ই আছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এ দেশের নারী ক্রিকেট এগিয়ে যাবে আরও বহুদূর।

কিন্তু সাবিনা, কৃষ্ণা কিংবা মারিয়া মান্ডাদের এ জয়কে আমি শুধু একটা ট্রফি জয়ের আনন্দের মধ্যে বন্দি করে রাখতে চাই না। এটি কেবল একটি খেলার উৎকর্ষতা নয়। এ জয়ের বহুমাত্রিক তাৎপর্য আছে। বাংলাদেশ নারী দলের খেলোয়াড়দের দেখুন। যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। এখানে সব ধর্মের মানুষের সম্মিলন ঘটেছে। সমতলের আদিবাসী, পাহাড়ি আদিবাসী, বাঙালি। সবাই মিলে একটি দল। যেমন সবাই মিলে এই বাংলাদেশ। এ তরুণ প্রাণ সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মেয়েরা কীভাবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের ভেদাভেদ উপড়ে ফেলেছেন। এ রকম একটি বাংলাদেশের স্বপ্নই তো আমরা দেখেছিলাম একাত্তরে। আমাদের স্বাধীনতার স্লোগান ছিল- ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান- আমরা সবাই বাঙালি’। সেই স্লোগানে এ নিপুণ চিত্ররূপ যেন মারিয়া মান্ডা, কৃষ্ণা আর সাবিনাদের দলটি। যখন ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের হিংস্র নখ আবার বেরিয়ে এসেছে, যখন ধর্মীয় উৎসবের আগে আতঙ্কের প্রহর গোনে আমাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তখন সম্প্রীতির বাংলাদেশের এক চিলতে উঠোন যেন আমাদের নারী ফুটবল দল।

সাবিনাদের আরেকটি ব্যাপার আমাকে মুগ্ধ করেছে। এরা সবাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। বাংলার গ্রামগঞ্জ থেকে উঠে এসেছেন এ অদম্য মেয়েরা। খুব সাধারণ বাঙালি পরিবার। এদের কারও বাবা দিনমজুর, কেউ কৃষক, কেউ ক্ষুদ্র বিক্রেতা, কেউ শ্রমিক, কেউ রাজমিস্ত্রি। এ সাধারণের শক্তি যে কত অপরাজেয় তা বোঝা গেল আরেকবার। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যেমন মুটে, মজুর, শ্রমিক, কৃষকের সম্মিলিত বিজয়গাথা। এদের বিজয়টাও তেমনি। এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই আমাদের শক্তি। কলসিন্দুর, রংপুর, সাতক্ষীরা, রাঙামাটির প্রত্যন্ত জনপদই আমাদের বাংলাদেশ। এ প্রান্তিক মানুষই দেশটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এ মেয়েরা স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটেছেন। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এ পর্যন্ত এসেছেন। সমাজের তথাকথিত শৃঙ্খলা এরা উপেক্ষা করেছেন। মানুষের কটূক্তি-উপহাস এরা পাত্তা দেননি। এদের লক্ষ্য ছিল অবিচল। এ মেয়েরা আমাদের সবাইকে বিশেষ করে নারীদের এক বড় শিক্ষা দিলেন। বাধা অতিক্রম করতে হবে। প্রতিকূলতা জয় করেই বিজয় ছিনিয়ে আনতে হয়। কঠিন পরিশ্রম এবং অবিচলে এগিয়ে গেলে লক্ষ্য অর্জিত হবেই। এ শিক্ষাটা কৃষ্ণা, রুপনা, স্বপ্নারা নতুন করে শেখালেন। একটু হতাশায় আত্মহত্যা নয়; খানিকটা ব্যর্থতায় বিষণ্ন্নতা নয়; কঠিন তিরস্কার কিংবা অবহেলায় আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া নয় বরং এসব পরাজিত করার নামই জীবন। সানজিদা, শিউলি, মনিকারা অভিভাবকদের জন্যও একটা বার্তা দিয়ে গেলেন- আমার মেয়ে পড়তে চায়, তাকে পড়তে দেব। আমার মেয়ে আকাশ স্পর্শ করতে চায়, আমি সায় দেব। আমার মেয়ে গান গাইতে চায়, গান গাইতে দেব। বারবার প্রতিনিয়ত তাকে বলব না, ‘তুমি মেয়ে। তোমাকে সংসার করতে হবে। স্বামীর জন্য রান্না শিখতে হবে। স্বামীর জামা-জুতা সাফ করতে হবে। ইচ্ছা করুক না করুক স্বামীর সঙ্গে শুতে হবে। তাকে সুখ দিতে হবে। তোমার ইচ্ছাটা মুখ্য নয়। তুমি স্বামীর জন্য উৎসর্গীকৃত এক প্রাণ। এটাই তোমার গন্তব্য।’ যেসব বাবা-মা তাঁদের মেয়েসন্তানদের এ শিক্ষায় গড়ে তুলতে চান, একজন ‘স্বামীর সেবক’ বানাতে চান- শিউলি, সাথী, রিতু তার এক মোক্ষম জবাব। আসুন না আমরা মারিয়া, রুপনা, মনিকাদের বাবা-মায়ের মতো উদার হই। আমাদের মেয়েদের জীবনকে দিই পূর্ণতা। এ জয় সবাইকে এ বার্তাটাও দিয়ে গেল। এ মেয়েদের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে আমি অদ্ভুত মিল পেয়েছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনের। এরা যেন লক্ষ্য স্থির করে বিপরীত স্রোতে সাঁতার কেটে পৌঁছেছে সোনালি বন্দরে। শেখ হাসিনার জীবনটাও তেমনি। এরা যেমন অসম্ভব শব্দটা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যাও তেমন। এরা যেমন অবহেলা, বঞ্চনায় হতোদ্যম হননি। তেমনি গল্প শেখ হাসিনারও। বুধবার শুনলাম এ মেয়েরা বারবার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। এদের সবাইকে বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রী গণভবনে ডেকে নিয়ে গেছেন। আদর করেছেন। হয়তো তাঁর সাহস, মনোবল সঞ্চারিত করেছেন এ কিশোরীদের মধ্যে। কী অদ্ভুত! এ সেপ্টেম্বরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। ২৮ সেপ্টেম্বর। জন্মদিনের আগে তাঁর প্রেরণায় অদম্য হয়ে ওঠা মেয়েরা যেন এক বিজয় পালক তুলে দিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যাকে। শেখ হাসিনা যেমন তাঁর সব অর্জন এ দেশের জনগণের জন্য উৎসর্গ করেন। অপরাজিতরাও তাঁদের বিজয় উৎসর্গ করলেন দেশবাসীকে। শেখ হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছেন এ আলোর পথযাত্রীরা। যে পথের গন্তব্য হলো নারী মুক্তির বাংলাদেশ।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

মারিয়া   কৃষ্ণা   সাবিনা   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

বিএনপির কোটি টাকার যুক্তরাষ্ট্র মিশন: ব্যর্থ হলো যেভাবে

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail বিএনপির কোটি টাকার যুক্তরাষ্ট্র মিশন: ব্যর্থ হলো যেভাবে

দেশে রাজপথে আন্দোলন করছে বিএনপি। সামনে আন্দোলন আরও বেগবান করবে এমন কথা বিএনপি নেতারা সুস্পষ্টভাবে বলছে। এমনকি কর্মীদেরকে লাঠিসোটা নিয়ে সমাবেশে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি বিএনপি নেতৃবৃন্দ এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দূতাবাসে গিয়ে বৈঠক করছে, সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ করছে এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি বাস্তবায়নের জন্য তাদের কাছে নানা রকম যুক্তি তুলে ধরেছে। এটুকুই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্ট এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিষেদাগার করার জন্য বিএনপি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে সেটিও বিএনপি এবং জামায়াত গোষ্ঠীর অপপ্রচারের ফল বলেও বিভিন্ন মহল মনে করে। গত কয়েক বছর ধরেই বিএনপির লবিস্ট ফার্ম এবং যুদ্ধাপরাধীদের একটি সক্রিয় গ্রুপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা রকম অপপ্রচার করছে। এই সমস্ত অপপ্রচারের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা নিচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। পাশাপাশি জাতিসংঘেও এই ধরণের অসত্য তথ্যগুলো সরবরাহ করা হয়েছে, যার প্রমাণ পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক সময়। এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরেও বিএনপি ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। বিএনপি এইজন্য কয়েক কোটি টাকা খরচ করেছিলো বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত করে। বিএনপির মূল পরিকল্পনা ছিল তিনটি।

প্রথমত, প্রধানমন্ত্রীর সফরে বিক্ষোভ মিছিল ইত্যাদি করে একটি দৃশ্যমান অনাস্থা দেখানো হবে যাতে আন্তর্জাতিক মহলে একটি বার্তা যায় যে, বর্তমান সরকারের ওপর প্রবাসীদের আস্থা নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সফরে তেমন কিছু সম্ভব হয়নি। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখানে ভালো শোডাউন করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়েছে।

বিএনপি-জামায়াতের দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছিল যে, জো বাইডেনের সঙ্গে যেন প্রধানমন্ত্রীর কোনো সাক্ষাৎ না হয়। এইজন্য বিএনপি একটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছিলো। প্রতিবার নিউ ইয়র্কে যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন হয় তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরকার এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে মিলিত হন এবং তাদেরকে সংবর্ধনা দেন। যতবার প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের অধিবেদনে যোগ দিতে গেছেন ততবারই তিনি এই সংবর্ধনায় দাওয়াত পেয়েছেন। এবার যেন প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত না দেওয়া হয়, সেজন্য বিএনপির লবিস্ট ফার্মরা খুব সক্রিয় ছিল। যেভাবে বাংলাদেশকে ‘গণতন্ত্র সম্মেলনে’ আমন্ত্রণ জানানো হয়নি সেভাবেই যেন শেখ হাসিনাকে এই সংবর্ধনায় দাওয়াত না দেওয়া হয় সেজন্য চেষ্টার কম করা হয়নি, কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে যেন দাওয়াত না দেওয়া হয় তার পেছনে যুক্তি হিসেবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচন ইত্যাদি প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিলো। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর লবিস্ট ফার্মের এই আবদার গ্রহণ করেনি। বরং হোয়াইট হাউজ জানিয়ে দেয়, শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতে জো বাইডেন আগ্রহী। আর এ কারণেই শেষ পর্যন্ত বিএনপির কোটি টাকার যুক্তরাষ্ট্র মিশন ব্যর্থ হয়ে গেল।

যুক্তরাষ্ট্র ষড়যন্ত্রে বিএনপির যে তৃতীয় ধাপ সেটি হলো, আজ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ দিবেন, সেই ভাষণের সময় বিক্ষোভ প্রদর্শন করা বা বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা। কিন্তু সেটিও সফল হচ্ছে না বলে বিভিন্ন সূত্র বাংলা ইনসাইডারকে নিশ্চিত করেছে।

বিএনপি  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

শেখ হাসিনাকে কি বার্তা দিলেন বাইডেন?

প্রকাশ: ০৮:০১ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail শেখ হাসিনাকে কি বার্তা দিলেন বাইডেন?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে অবস্থান করছেন। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা। এর মধ্যে গত বুধবার ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে তিনি যোগদান করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য নিউ ইয়র্কে আসা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তার পত্নী আমেরিকার মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল লটেতে প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একেএম আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, বাইডেন এবং তাঁর পত্নী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এসময় উভয় নেতা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে সে ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে বাইডেনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাইডেন কি বার্তা দিলেন, সেটি রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার সঙ্গে বাইডেনের আলাপে কোন বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই বলা হয়নি। তবে এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর যোগদান বাইডেনের সঙ্গে তার আলাপ রাজনীতিতে তাৎপর্য এবং গুরুত্ব বহন করে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জো বাইডেনের গ্রহণযোগ্যতা পেল বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর মাধ্যমে আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হলো যে, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখনো তলানিতে যেয়ে ঠেকেনি। দুই দেশই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী। এরকম পরিস্থিতি না হলে বাইডেনের এই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা হয়তো আমন্ত্রণ পেতেন না।

গত কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে নানারকম টানাপোড়নের কথা শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে বেশকিছু স্পর্শকাতর ইস্যু সামনে চলে এসেছে। জো বাইডেন গত বছর যে গণতন্ত্র সম্মেলন ডেকেছিলেন সেই সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানায়নি। এই আমন্ত্রণ না জানানো নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমন্ত্রণ না জানানোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা নতুন ডং। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এছাড়াও র‍্যাবের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি মনগড়া ভিত্তিহীন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই রিপোর্টের ব্যাপারেও বাংলাদেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। দু'দেশের সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি উচ্চপর্যায়ের দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সেখানে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ব্লিঙ্কেনে সঙ্গেও বৈঠক করেন। এই সমস্ত বৈঠকে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও তেমন সাড়া দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এরকম একটি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং জো বাইডেনের আমন্ত্রণের যাওয়াটা একটি বড় মেরুকরণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, বাইডেন এবং শেখ হাসিনার মধ্যে যে আলোচনায় হোক না কেন, এর মাধ্যমে বাইডেন একটি বার্তা সুস্পষ্ট করলো। তা হলো আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি জো বাইডেনের আলাদা কোনো নেতিবাচক মনোভাব নেই। তবে বিভিন্ন কূটনৈতিক মহল বলছে, এই সমস্ত আলোচনা হয় স্রেফ সৌজন্যমূলক। এ ধরনের আলোচনা দেশের অভ্যন্তরীণ জটিল রাজনৈতিক ইস্যু বা অন্যান্য ইস্যু প্রাধান্য পায়না।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ঢাকার অধিকাংশ আসনেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত

প্রকাশ: ০৭:০৩ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail ঢাকার অধিকাংশ আসনেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। সারাদেশে শুরু হয়েছে জরিপ এবং প্রার্থীদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ। এ কাজ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগরীকে একটি সংকটাপন্ন জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে মাঠ জরিপে আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরীর নির্বাচনী এলাকাগুলোতে হতশ্রী অবস্থার কথা পাওয়া গেছে। ঢাকা মহানগরীতে মোট ১৫টি নির্বাচনী আসন রয়েছে। এই ১৫টি আসনের মধ্যে দুটি জাতীয় পার্টির কাছে, একটি ওয়ার্কার্স পার্টির কাছে আওয়ামী লীগ দিয়েছিলো। আগামী নির্বাচনে এই তিনটি আসনে অন্য কাউকে দেয়া হবে কিনা বা জাতীয় পার্টিকে দেয়া হবে কিনা এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন যে, এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামা হচ্ছে, সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীই খোঁজা হচ্ছে।

ঢাকা-৪ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সৈয়দ আবু হোসেনের এলাকায় অবস্থান তলানিতে। তবে যেহেতু তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশে জাতীয় পার্টির সঙ্গে যদি আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে তাহলে অন্যরকম হিসেবে এ আসনে, না হলে আওয়ামী লীগ এখানে একজন যোগ্য প্রার্থীকে খুঁজে বের করবেন। ঢাকা-৫ আসনের মূল প্রার্থী ছিলেন হাবিবুর রহমান মোল্লা। তিনি মারা যাওয়ার পর এখানে ২০২০ সালের ১৭ অক্টোবর উপনির্বাচন হয়। উপনির্বাচনে কাজী মনিরুল ইসলাম মনুকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয় কিন্তু তিনি এলাকায় তেমন কোনো ইতিবাচক ভাবমূর্তি এখনো পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারেনি বলেই আওয়ামী লীগের তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। ঢাকা-৬ আসনটি কাজী ফিরোজ রশীদকে দেওয়া হয়েছিলো। এটিও যেহেতু জাতীয় পার্টিকে দেওয়া আসন সেহেতু এই আসনের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জোট বিন্যাসের পরপর। ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী সেলিম। কিন্তু তিনি এবার আর সর্বোচ্চ আদালতকর্তৃক দুর্নীতির দায়ে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর অযোগ্যতা নিয়ে কোনো রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। কিন্তু আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়াটা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে এবং আইনগত বাধ্যবাধকতা কারণে তিনি নির্বাচন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। ঢাকা-৮ আসনটি আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননকে দিয়েছিলো। রাশেদ খান মেনন আগামী নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটে থাকুক না থাকুক, এই আসনে তিনি মনোনয়ন পাচ্ছে না এটি মোটামুটি নিশ্চিত। এলাকায় তার গ্রহণযোগ্যতা এবং অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। ঢাকা-৯ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি এলাকায় তার ইমেজ ধরে রেখেছেন এবং তিনি আরেকবার প্রার্থী হতে পারেন এমন সম্ভাবনাই প্রবল। আওয়ামী লীগের জন্য স্পর্শকাতর আসন হলো ঢাকা-১০। এই আসনে আওয়ামী লীগ শেখ ফজলে নূর তাপস তিনবার নির্বাচন করেছেন। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হয়ে যাওয়ার পর এই আসনে গার্মেন্টস ব্যবসায়ী শফিউল আলম মহিউদ্দিনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ২১ শে মার্চ ২০২০ সালে তিনি এখানে নির্বাচিত হন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি আসলে তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতে পেরেছেন বা জনগণের মধ্যে রেখাপাত করতে পেরেছেন বলে আওয়ামী লীগ মনে করে না, এই আসনে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। একেএম রহমত উল্লাহ এখন ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। তিনি ঢাকা-১১ আসনের এমপি হলেও তার কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত এবং সীমাবদ্ধতা বলে আওয়ামী লীগের তথ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

ঢাকা-১২ আসনের এমপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তিনি এলাকায় জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন। আগামী নির্বাচনে তাঁর মনোনয়ন প্রাপ্তি মোটামুটি নিশ্চিত। ঢাকা-১৩ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি সাদেক খান। গত নির্বাচনে জাহাঙ্গীর কবির নানককে বাদ দিয়ে তাকে নির্বাচিত করা হয়েছিলো। কিন্তু সাদেক খান কতটুকু সাফল্যের সঙ্গে তার নির্বাচনী এলাকা সামলাতে পারছে এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। আগামী নির্বাচনে তিনি যদি মনোনয়ন না পান তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ঢাকা-১৪ আসনে আওয়ামী লীগের মূল প্রার্থী ছিলেন আসলামুল হক। কিন্তু তাঁর আকর্ষিক মৃত্যুর পর আগা খান মিন্টু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে এমপি হয়েছেন। কিন্তু এলাকায় তাঁর অবস্থান সংহত নয়। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এই আসনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। ঢাকা-১৫ আসনে কামাল আহমেদ মজুমদার এলাকায় তার অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং তিনি আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকা-১৬ আসনে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লারও এলাকায় অবস্থান সংহত। তিনি আগামী নির্বাচনে কোনো রকম বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটলে মনোনয়ন পাবেন বলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সুযোগ মনে করেন।

চিত্রনায়ক ফারুককে ঢাকা-১৭ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু তিনি অসুস্থ। এখনো তিনি চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে রয়েছেন। ফারুকের আসনটি পরিবর্তন হওয়া অনিবার্য এবং এই আসনে আওয়ামী লীগ কোনো হেভিওয়েট প্রার্থী দেয়ার কথা ভাবছে। ঢাকা-১৮ আসন থেকে কয়েকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী সাহারা খাতুনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু তার মৃত্যুর পর মো. হাবিব হাসানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এখানেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী পরিবর্তন করতে পারে এবং কোনো হেভিওয়েট প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড় করাতে পারে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে, একটা সময় ছিল আওয়ামী লীগ বিএনপি দুটি দলই ঢাকায় হেভিওয়েট প্রার্থী দিত। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে দু'টি দলই সরে এসেছে। তবে এবার নির্বাচনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে ঢাকার আসনে চমক হিসেবে দেখা যেতে পারে বলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র আভাস দিয়েছে।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হচ্ছে কবে?

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হচ্ছে কবে?

২০০৩ সালের ১৯ মার্চ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করল। এক মাসের বেশি সময়ের এই যুদ্ধে অন্যতম আলোচিত নাম ছিল মোহাম্মদ সাইদ আল সাহাফ। একতরফা এই যুদ্ধ তিনি একাই প্রায় জমিয়ে দিয়েছিলেন। ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী। যুদ্ধে তিনি সাদ্দাম হোসেনের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রায় প্রতিদিনই তিনি টেলিভিশনে এসে চমকপ্রদ সব কথা বলতেন। তিনি বলতেন ‘খুব শিগগির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতন হচ্ছে। মার্কিনিরা পিছু হটছে।’ এমনকি মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী যখন নিশ্চিত বিজয়ের পথে তখনো সাদ্দামের প্রিয়ভাজন মোহাম্মদ সাইদ বলছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পতন ঘণ্টা বেজে গেছে। তারা পালানোর পথ পাবে না।’ ২০০৩-এর ৯ এপ্রিল শেষবারের মতো টেলিভিশনের পর্দায় এসেছিলেন মোহাম্মদ সাইদ আল সাহাফ। তিনি বলেছিলেন, ‘মার্কিনিরা আত্মসর্মপণ করবে অথবা তারা তাদের ট্যাংক পুড়িয়ে দেবে।’ ওই সময়ে সাহাফের বক্তব্যে কট্টর ইরাকপন্থিরা কিছু সময় উল্লসিত হতেন। অলীক স্বপ্নে বিভোর হতেন। অনেক উগ্রবাদী ইরাকে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার খোয়াবও দেখতেন। সাহাফের কথন শুধু কিছু মানুষকে ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্ত করেছিল মাত্র। প্রায় কুড়ি বছর, এখন প্রায়ই ইরাকের তথ্যমন্ত্রীর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ার প্রধান কারণ হলো ইদানীং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন নেতার বক্তব্য। বিএনপি এখন নানা ইস্যুতে আন্দোলন করছে। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নানারকম সভা-সমাবেশ এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। এসব কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল এবং তার সহকর্মীরা যেন ‘সাহাফ’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রতিদিন বিএনপি নেতারা বলছেন, ‘সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’ ‘আওয়ামী লীগের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে’ ইত্যাদি। বিএনপি নেতাদের এই বক্তব্য শুনে নিজের অজান্তেই প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটছে কবে?

অবশ্য বিএনপি নেতাদের উজ্জীবিত বক্তব্যের  পেছনে আওয়ামী লীগের কতিপয় মহাগুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং মন্ত্রীর অপরিসীম অবদান রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আছেন যাদের সাধারণ মানুষ এখন ‘বিএনপি-বিষয়ক মন্ত্রী’ হিসেবেই চেনেন। এদের প্রধান এবং একমাত্র কাজ হলো, বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করা। বাহাস করা। বাহাস করতে করতেই আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা মৃতপ্রায় বিএনপিকে নতুন জীবন দিচ্ছেন। নতুন জীবন পাওয়া বিএনপি এখন সরকারকে খাদের কিনারায় দেখছে। তারা বলছে, জনগণ ফুঁসে উঠছে।

একটি সরকারের পতন কয়েকভাবে হতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তনের প্রধান উপায় হলো নির্বাচন। আগামী ১৫ মাসের মধ্যে দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গত বুধবার (১৪ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী বছরের নভেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হবে। ২০২৩-এর ডিসেম্বর অথবা ২০২৪-এর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। এই রোডম্যাপ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি বলেছে, তারা এই রোডম্যাপ মানে না। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, ‘এই সরকার অবৈধ। অবৈধ সরকার গঠিত নির্বাচন কমিশনও অবৈধ’। বেশ ভালো কথা। তাহলে ‘অবৈধ সরকারে’র অবৈধ সংসদে বিএনপির এমপিরা কী করছেন? অবৈধ সরকারের কাছে কেন বেগম জিয়া মুক্তি প্রার্থনা করেন? দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে বিএনপি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া আগামী নির্বাচনে যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএনপি কেবল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়নি। বলেছে, এরকম নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। ভারত সফর নিয়ে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি বললেন, ‘সংবিধানের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। সংবিধান অনুযায়ীই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ তিনি পরোক্ষভাবে বিরোধী দলের দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘কে নির্বাচন করবে, কে করবে না, এটা তাদের ব্যাপার।’ অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করবে কী করবে না, এ নিয়ে রাজনীতিতে একটা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ১৫ মাসে এই অনিশ্চয়তা কীভাবে দূর হবে তা দেখার বিষয়। অন্য নির্বাচনগুলোর চেয়ে আগামী নির্বাচন নিয়ে কূটনৈতিক মহলের আগ্রহ বেশি। দেড় বছর আগে থেকেই তারা মাঠে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো জানিয়ে দিয়েছে তারা বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু দেখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ‘আগামী নির্বাচনে যেন জনমতের প্রতিফলন ঘটে।’ এরকম পরিস্থিতিতে বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটিও এক বড় প্রশ্ন। বিএনপি নেতারা বলছেন, আগে সরকারের পতন, তারপর নির্বাচন। তাহলে, নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতা পরিবর্তন চায় না?

ক্ষমতা বদলের আরেকটি উপায় হলো গণঅভ্যুত্থান। গণআন্দোলন। যেভাবে জাতির পিতার নেতৃত্বে বাঙালি জাতি আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়েছিল। দুই নেত্রীর নেতৃত্বে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে তীব্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে বেগম জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগই একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা কখনো আন্দোলনের মাধ্যমে বা গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারায়নি। আওয়ামী লীগকে দুবার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। একবার আওয়ামী লীগ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে।

১৯৫৪ সালের ২০ মার্চ নির্বাচনে হক ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্টে আওয়ামী লীগ প্রধান দল ছিল। নির্বাচনে ৩০৯টি প্রাদেশিক পরিষদের আসনের মধ্যে ২৩৭টি ছিল মুসলিমদের জন্য। যুক্তফ্রন্ট এর মধ্যে ২২৩টিতে জয়লাভ করে। মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন। অমুসলিম আসনে কংগ্রেস ২৫টি, তফসিলি ফেডারেশন ২৭টি, যুক্তফ্রন্ট ১৩টি আসন পায়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে জনরায় পায়। আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ৩ এপ্রিল গঠিত তাঁর প্রথম মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের কাউকেই রাখেননি। এক মাস পর ১৯৫৪-এর ১৫ মে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করা হলে আওয়ামী লীগ থেকে সাতজনকে মন্ত্রী করা হয়। কিন্তু এই মন্ত্রিসভা ছিল কয়েক দিনের। আদমজীতে দাঙ্গার অজুহাত দেখিয়ে ৩০ মে ৯২ (ক) ধারা জারি করে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় যুক্তফ্রন্ট সরকারকে। জারি করা হয় গভর্নর শাসন।

সত্তরের নির্বাচনে গোটা বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পায়। কিন্তু নির্বাচনে জিতেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পারেনি। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পাই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় জঘন্য নৃশংসতার মাধ্যমে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে একাত্তরের পরাজিত শক্তি।

১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে ২০০১ সালের জুলাইয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে আওয়ামী লীগ। এটাই ছিল বাংলাদেশে প্রথম শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক রীতিতে ক্ষমতার হাতবদল। অর্থাৎ আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে ইতিহাস সৃষ্টি করতে হবে বিএনপিকে। এরকম আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য নেতা লাগে। বিএনপির নেতা কে? এরকম আন্দোলন গড়ে তুলতে সংগঠন লাগে। সে রকম সংগঠন কোথায়?

’৭২ থেকে ’৭৫, জাসদ, গণবাহিনী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। জ¦ালাও-পোড়াও করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাওয়ের নামে সন্ত্রাসী তান্ডব চালিয়েছে। গণবাহিনীর নামে নির্বিচারে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের। কিন্তু এসব বিপথগামিতা কেবলই ষড়যন্ত্রকারীদের পথ প্রশস্ত করেছে। জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের হঠকারিতা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটাতে পারেনি। ’৯৬-এ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা ইস্যুতে আন্দোলন করেছে বিএনপি-জামায়াত জোট। কিন্তু সেই আন্দোলনে ছিল না কোনো কারণ। পাশে ছিল না জনগণ। ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে আন্দোলন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। সাঈদীকে চাঁদে দেখা গুজব ছড়িয়ে সারা দেশে তান্ডব ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু এতে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর কোনো চাপ আসেনি। ২০১৩ সালে বেগম জিয়া নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহতের ডাক দিয়েছিলেন। আশা করেছিলেন, এতেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হবে। জ্বালাও-পোড়াও, অবরোধ-হরতাল করেও সরকার টলাতে পারেননি বেগম জিয়া। বন্ধ করতে পারেননি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর নিজেই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন বেগম জিয়া। ২০১৪-এর নির্বাচন ছিল আসলে সাংবিধানিক দায় পূরণ। দেড় শর বেশি আসনে একক প্রার্থী ছিলেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা। অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি আসল নির্বাচন নয়। কদিন পরে মূল নির্বাচন হবে। এ কারণে কিছু অতি-উৎসাহী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। তা না হলে এই নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারত। ২০১৪-এর নির্বাচনের পর অধিকাংশ রাজনীতিবিদ আরেকটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। বেগম জিয়াও সম্ভবত নিশ্চিত ছিলেন স্বল্প সময়ের মধ্যে নতুন নির্বাচন হবে। এ কারণেই ওই নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে তিনি লাগাতার অবরোধের ডাক দেন। নিজে অবস্থান নেন গুলশানে তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে। গাড়িতে আগুন, গানপাউডার দিয়ে মানুষ পোড়ানোর পরও সরকার পতন হয়নি। বিএনপিই উল্টো খাদের কিনারায় চলে গেছে। সে সময় বিএনপি চেয়ারপারসন সরকার পতনের দিনক্ষণ ঠিক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই ভুল আন্দোলনে তিনি নিজেই রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন।

২০১৮-এর নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছিল বিনা শর্তে। অস্তিত্বের প্রয়োজনে। ড. কামাল হোসেনকে নেতা মেনে তারা ‘ভোট বিপ্লব’ করতে চেয়েছিল। ২০১৮-এর নির্বাচন ছিল আমলাদের ষড়যন্ত্র। সরকারের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ছড়ি ঘোরানোর জন্য তারা একটি সুন্দর নির্বাচনের সম্ভাবনা তছনছ করে দেন। আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে যাই বলুক, একান্তে নিজেরাও স্বীকার করে, ওই নির্বাচন ছিল ‘ভুতুড়ে নির্বাচন’। আমি এখনো বিশ্বাস করি, ২০১৮-তে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই। ইতিহাস এক দিন নিশ্চয়ই এই নির্বাচন মূল্যায়ন করবে। যারা দেশে গণতন্ত্র চান না, বিরাজনীতিকে লালন করেন, তারাই ২০১৮-এর নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। ওই নির্বাচনের পর বিএনপি ন্যূনতম আন্দোলন করতে পারেনি। নির্বাচনের ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আবার জাতীয় সংসদেও গেছে। এখন বিএনপি নির্বাচনের ১৫ মাস আগে সরকার পতনের ডাক দিচ্ছে। আন্দোলন করে কি আওয়ামী লীগকে হটানো যাবে? ইতিহাস বলে না। কারণ, আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের একমাত্র সংগঠন যেটি তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই তৃণমূলই আওয়ামী লীগের শক্তি। যে কোনো সংকটে এরা রুখে দাঁড়ায়। গত ১৩ বছরে আওয়ামী লীগের যেমন অনেক অর্জন আছে, তেমনি অনেক ব্যর্থতাও আছে। এই সময়ে আওয়ামী লীগে সুযোগ সন্ধানীদের মেলা বসেছে। আওয়ামী লীগার হয়ে অনেকে বেশুমার অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন। কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি অর্থ পাচার করে ব্যাংকগুলোকে প্রায় ফোকলা বানিয়ে দিয়েছেন। কিছু অযোগ্য দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্ত্রীর কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যর্থতা সত্ত্বেও গত ১৩ বছরে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগে একজন শেখ হাসিনা আছেন। যিনি অসম্ভব সাহসী, দূরদর্শী এবং জনদরদি। একজন নেতা একাই কি অসাধ্য সাধন করতে পারেন, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ শেখ হাসিনা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ দেশের সিংহভাগ মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করে। তাঁর ওপর আস্থা রাখে। এই মুহূর্তে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। এ দেশের বড় একটা জনগোষ্ঠী মনে করে, শেখ হাসিনা না থাকলে এই দেশ অচল হয়ে যাবে। মুখ থুবড়ে পড়বে। মৌলবাদীরা দেশটা শকুনের মতো ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাবে। বাংলাদেশ একটা আফগানিস্তান হয়ে যাবে। এ কারণেই এ দেশের মানুষ এসব আন্দোলনে গা মাখে না। সংকটে হতাশ হয়, কিন্তু ক্ষুব্ধ হয় না। আশায় বুক বাঁধে। এদের অধিকাংশ মানুষই মনে করে ‘অন্ধকার যতই গভীরে হোক, ভোর আসবেই’। একজন শেখ হাসিনা আছেন- এ জন্যই আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের মাধ্যমে হটানো যাবে না। চা শ্রমিক থেকে ভূমিহীন। খেতমজুর থেকে ব্যবসায়ী। নারী, পুরুষ, শিশু। সবার আস্থার জায়গার নাম শেখ হাসিনা। এ কারণেই সরকারের পতনের দাবিতে গণজোয়ার হয় না। এটা বিএনপির নেতারাও ভালো করে জানেন। দলীয় কর্মীদের সেøাগান আর ঝালমুড়ির উৎসবে সরকার পতন হয় না। জনগণ লাগে। বিএনপির আন্দোলনের কর্মী আছে, জনগণ নেই। একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আরেকটি উপায় আছে। অবৈধ পন্থা এবং ষড়যন্ত্র। যেভাবে ’৭৫-এ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। যেভাবে ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময় আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়াকে বিলম্বিত করা হয়েছিল। তাহলে আওয়ামী লীগের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে বলে কি বিএনপি নেতারা সেই ষড়যন্ত্রের বার্তাই দিচ্ছেন? নির্বাচন যেমন ক্ষমতাবদলের একমাত্র সাংবিধানিক পন্থা, তেমনি ‘নির্বাচন বন্ধ’ অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখলের সবচেয়ে বড় অসাংবিধানিক পথ। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন যেন না হয় সে জন্য একটি মহল তৎপর। বিএনপির হুমকি জাতীয় পার্টির অস্থিরতা, ১৪ দলের কারও কারও আহাজারি একসূত্রে গাঁথা। কিছুদিন আগে সুশীল সমাজের পন্ডিতগণ ঘোষণা করেছিলেন, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে। এখন তারা তাদের হৃদয় এবং মস্তিষ্ক উৎসর্গ করেছেন নির্বাচনে। আগামী নির্বাচন যেন না হয় সে জন্য নানারকম তৎপরতা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো কেন এত আগে থেকে নির্বাচন নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে? এসব কিছু ‘পাজল গেমে’র মতো। রাজনীতি এখন মাঠে নেই। দাবার ছকে বন্দি হয়ে গেছে। আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায় প্রাসাদ ষড়যন্ত্রেই এখন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার মহাপরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। বিএনপি নেতারা হয়তো সেই আশাতেই ‘পতন’ ‘পতন’ বলে চিৎকার করছেন। কিন্তু বারবার ষড়যন্ত্রে ক্ষতবিক্ষত শেখ হাসিনা এখন ষড়যন্ত্রের গন্ধ আগেই টের পান। এ জন্য জনগণকে আগাম সতর্কবার্তাও দিয়ে রেখেছেন। গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের কিছু মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র করে সরকার উচ্ছেদ এখন সহজ রেসিপি নয়। বলে-কয়েও ষড়যন্ত্র হয় না। মির্জা ফখরুল ইসলাম ষড়যন্ত্রের সেই পুরনো খেলায় মগ্ন হয়ে গেছেন। রাস্তায় জ্বালাও-পোড়াও হবে। আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হবে। তৃতীয় শক্তি ক্ষমতা নেবে। হরতাল-অবরোধ যেমন আন্দোলনের অস্ত্র হিসেবে অচল হয়েছে, তেমনি ষড়যন্ত্রের এই ফর্মুলাও বস্তাপচা হয়ে গেছে। কিন্তু আমার শঙ্কা মির্জা ফখরুল এবং বিএনপি নেতাদের নিয়ে। আগে তারা রোজার পর, ঈদের পর, শীতের পর, বর্ষার পর আন্দোলনের ঘোষণা দিতেন। এখন তারা সরাসরি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঘোষণা দিচ্ছেন। শীত-বসন্তে যেমন আন্দোলন হয়নি, তেমনি যদি এবার আগাম ঘোষণাতেও সরকারেরও পতন না হয় তাহলে তারা আর রাজনীতিবিদ থাকবেন কি? ইরাকের সাইদ আল সাহাফকে শেষ দিকে বলা হতো ‘কমিক আলি’ (বাগদাদ বব)। মির্জা ফখরুলের মতো ব্যক্তিরা যদি শেষ পর্যন্ত তেমন উপাধি পান তাহলে রাজনীতির কী হবে?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

আওয়ামী লীগ   সরকারের   পতন   হচ্ছে কবে?  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন