এডিটর’স মাইন্ড

আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হচ্ছে কবে?

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হচ্ছে কবে?

২০০৩ সালের ১৯ মার্চ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করল। এক মাসের বেশি সময়ের এই যুদ্ধে অন্যতম আলোচিত নাম ছিল মোহাম্মদ সাইদ আল সাহাফ। একতরফা এই যুদ্ধ তিনি একাই প্রায় জমিয়ে দিয়েছিলেন। ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী। যুদ্ধে তিনি সাদ্দাম হোসেনের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রায় প্রতিদিনই তিনি টেলিভিশনে এসে চমকপ্রদ সব কথা বলতেন। তিনি বলতেন ‘খুব শিগগির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতন হচ্ছে। মার্কিনিরা পিছু হটছে।’ এমনকি মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী যখন নিশ্চিত বিজয়ের পথে তখনো সাদ্দামের প্রিয়ভাজন মোহাম্মদ সাইদ বলছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পতন ঘণ্টা বেজে গেছে। তারা পালানোর পথ পাবে না।’ ২০০৩-এর ৯ এপ্রিল শেষবারের মতো টেলিভিশনের পর্দায় এসেছিলেন মোহাম্মদ সাইদ আল সাহাফ। তিনি বলেছিলেন, ‘মার্কিনিরা আত্মসর্মপণ করবে অথবা তারা তাদের ট্যাংক পুড়িয়ে দেবে।’ ওই সময়ে সাহাফের বক্তব্যে কট্টর ইরাকপন্থিরা কিছু সময় উল্লসিত হতেন। অলীক স্বপ্নে বিভোর হতেন। অনেক উগ্রবাদী ইরাকে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার খোয়াবও দেখতেন। সাহাফের কথন শুধু কিছু মানুষকে ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্ত করেছিল মাত্র। প্রায় কুড়ি বছর, এখন প্রায়ই ইরাকের তথ্যমন্ত্রীর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ার প্রধান কারণ হলো ইদানীং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন নেতার বক্তব্য। বিএনপি এখন নানা ইস্যুতে আন্দোলন করছে। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নানারকম সভা-সমাবেশ এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। এসব কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল এবং তার সহকর্মীরা যেন ‘সাহাফ’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রতিদিন বিএনপি নেতারা বলছেন, ‘সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’ ‘আওয়ামী লীগের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে’ ইত্যাদি। বিএনপি নেতাদের এই বক্তব্য শুনে নিজের অজান্তেই প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটছে কবে?

অবশ্য বিএনপি নেতাদের উজ্জীবিত বক্তব্যের  পেছনে আওয়ামী লীগের কতিপয় মহাগুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং মন্ত্রীর অপরিসীম অবদান রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আছেন যাদের সাধারণ মানুষ এখন ‘বিএনপি-বিষয়ক মন্ত্রী’ হিসেবেই চেনেন। এদের প্রধান এবং একমাত্র কাজ হলো, বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করা। বাহাস করা। বাহাস করতে করতেই আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা মৃতপ্রায় বিএনপিকে নতুন জীবন দিচ্ছেন। নতুন জীবন পাওয়া বিএনপি এখন সরকারকে খাদের কিনারায় দেখছে। তারা বলছে, জনগণ ফুঁসে উঠছে।

একটি সরকারের পতন কয়েকভাবে হতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তনের প্রধান উপায় হলো নির্বাচন। আগামী ১৫ মাসের মধ্যে দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গত বুধবার (১৪ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী বছরের নভেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হবে। ২০২৩-এর ডিসেম্বর অথবা ২০২৪-এর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। এই রোডম্যাপ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি বলেছে, তারা এই রোডম্যাপ মানে না। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, ‘এই সরকার অবৈধ। অবৈধ সরকার গঠিত নির্বাচন কমিশনও অবৈধ’। বেশ ভালো কথা। তাহলে ‘অবৈধ সরকারে’র অবৈধ সংসদে বিএনপির এমপিরা কী করছেন? অবৈধ সরকারের কাছে কেন বেগম জিয়া মুক্তি প্রার্থনা করেন? দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে বিএনপি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া আগামী নির্বাচনে যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএনপি কেবল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়নি। বলেছে, এরকম নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। ভারত সফর নিয়ে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি বললেন, ‘সংবিধানের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। সংবিধান অনুযায়ীই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ তিনি পরোক্ষভাবে বিরোধী দলের দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘কে নির্বাচন করবে, কে করবে না, এটা তাদের ব্যাপার।’ অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করবে কী করবে না, এ নিয়ে রাজনীতিতে একটা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ১৫ মাসে এই অনিশ্চয়তা কীভাবে দূর হবে তা দেখার বিষয়। অন্য নির্বাচনগুলোর চেয়ে আগামী নির্বাচন নিয়ে কূটনৈতিক মহলের আগ্রহ বেশি। দেড় বছর আগে থেকেই তারা মাঠে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো জানিয়ে দিয়েছে তারা বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু দেখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ‘আগামী নির্বাচনে যেন জনমতের প্রতিফলন ঘটে।’ এরকম পরিস্থিতিতে বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটিও এক বড় প্রশ্ন। বিএনপি নেতারা বলছেন, আগে সরকারের পতন, তারপর নির্বাচন। তাহলে, নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতা পরিবর্তন চায় না?

ক্ষমতা বদলের আরেকটি উপায় হলো গণঅভ্যুত্থান। গণআন্দোলন। যেভাবে জাতির পিতার নেতৃত্বে বাঙালি জাতি আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়েছিল। দুই নেত্রীর নেতৃত্বে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে তীব্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে বেগম জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগই একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা কখনো আন্দোলনের মাধ্যমে বা গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারায়নি। আওয়ামী লীগকে দুবার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। একবার আওয়ামী লীগ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে।

১৯৫৪ সালের ২০ মার্চ নির্বাচনে হক ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্টে আওয়ামী লীগ প্রধান দল ছিল। নির্বাচনে ৩০৯টি প্রাদেশিক পরিষদের আসনের মধ্যে ২৩৭টি ছিল মুসলিমদের জন্য। যুক্তফ্রন্ট এর মধ্যে ২২৩টিতে জয়লাভ করে। মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন। অমুসলিম আসনে কংগ্রেস ২৫টি, তফসিলি ফেডারেশন ২৭টি, যুক্তফ্রন্ট ১৩টি আসন পায়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে জনরায় পায়। আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ৩ এপ্রিল গঠিত তাঁর প্রথম মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের কাউকেই রাখেননি। এক মাস পর ১৯৫৪-এর ১৫ মে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করা হলে আওয়ামী লীগ থেকে সাতজনকে মন্ত্রী করা হয়। কিন্তু এই মন্ত্রিসভা ছিল কয়েক দিনের। আদমজীতে দাঙ্গার অজুহাত দেখিয়ে ৩০ মে ৯২ (ক) ধারা জারি করে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় যুক্তফ্রন্ট সরকারকে। জারি করা হয় গভর্নর শাসন।

সত্তরের নির্বাচনে গোটা বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পায়। কিন্তু নির্বাচনে জিতেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পারেনি। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পাই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় জঘন্য নৃশংসতার মাধ্যমে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে একাত্তরের পরাজিত শক্তি।

১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে ২০০১ সালের জুলাইয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে আওয়ামী লীগ। এটাই ছিল বাংলাদেশে প্রথম শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক রীতিতে ক্ষমতার হাতবদল। অর্থাৎ আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে ইতিহাস সৃষ্টি করতে হবে বিএনপিকে। এরকম আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য নেতা লাগে। বিএনপির নেতা কে? এরকম আন্দোলন গড়ে তুলতে সংগঠন লাগে। সে রকম সংগঠন কোথায়?

’৭২ থেকে ’৭৫, জাসদ, গণবাহিনী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। জ¦ালাও-পোড়াও করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাওয়ের নামে সন্ত্রাসী তান্ডব চালিয়েছে। গণবাহিনীর নামে নির্বিচারে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের। কিন্তু এসব বিপথগামিতা কেবলই ষড়যন্ত্রকারীদের পথ প্রশস্ত করেছে। জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের হঠকারিতা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটাতে পারেনি। ’৯৬-এ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা ইস্যুতে আন্দোলন করেছে বিএনপি-জামায়াত জোট। কিন্তু সেই আন্দোলনে ছিল না কোনো কারণ। পাশে ছিল না জনগণ। ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে আন্দোলন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। সাঈদীকে চাঁদে দেখা গুজব ছড়িয়ে সারা দেশে তান্ডব ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু এতে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর কোনো চাপ আসেনি। ২০১৩ সালে বেগম জিয়া নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহতের ডাক দিয়েছিলেন। আশা করেছিলেন, এতেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হবে। জ্বালাও-পোড়াও, অবরোধ-হরতাল করেও সরকার টলাতে পারেননি বেগম জিয়া। বন্ধ করতে পারেননি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর নিজেই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন বেগম জিয়া। ২০১৪-এর নির্বাচন ছিল আসলে সাংবিধানিক দায় পূরণ। দেড় শর বেশি আসনে একক প্রার্থী ছিলেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা। অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি আসল নির্বাচন নয়। কদিন পরে মূল নির্বাচন হবে। এ কারণে কিছু অতি-উৎসাহী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। তা না হলে এই নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারত। ২০১৪-এর নির্বাচনের পর অধিকাংশ রাজনীতিবিদ আরেকটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। বেগম জিয়াও সম্ভবত নিশ্চিত ছিলেন স্বল্প সময়ের মধ্যে নতুন নির্বাচন হবে। এ কারণেই ওই নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে তিনি লাগাতার অবরোধের ডাক দেন। নিজে অবস্থান নেন গুলশানে তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে। গাড়িতে আগুন, গানপাউডার দিয়ে মানুষ পোড়ানোর পরও সরকার পতন হয়নি। বিএনপিই উল্টো খাদের কিনারায় চলে গেছে। সে সময় বিএনপি চেয়ারপারসন সরকার পতনের দিনক্ষণ ঠিক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই ভুল আন্দোলনে তিনি নিজেই রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন।

২০১৮-এর নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছিল বিনা শর্তে। অস্তিত্বের প্রয়োজনে। ড. কামাল হোসেনকে নেতা মেনে তারা ‘ভোট বিপ্লব’ করতে চেয়েছিল। ২০১৮-এর নির্বাচন ছিল আমলাদের ষড়যন্ত্র। সরকারের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ছড়ি ঘোরানোর জন্য তারা একটি সুন্দর নির্বাচনের সম্ভাবনা তছনছ করে দেন। আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে যাই বলুক, একান্তে নিজেরাও স্বীকার করে, ওই নির্বাচন ছিল ‘ভুতুড়ে নির্বাচন’। আমি এখনো বিশ্বাস করি, ২০১৮-তে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই। ইতিহাস এক দিন নিশ্চয়ই এই নির্বাচন মূল্যায়ন করবে। যারা দেশে গণতন্ত্র চান না, বিরাজনীতিকে লালন করেন, তারাই ২০১৮-এর নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। ওই নির্বাচনের পর বিএনপি ন্যূনতম আন্দোলন করতে পারেনি। নির্বাচনের ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আবার জাতীয় সংসদেও গেছে। এখন বিএনপি নির্বাচনের ১৫ মাস আগে সরকার পতনের ডাক দিচ্ছে। আন্দোলন করে কি আওয়ামী লীগকে হটানো যাবে? ইতিহাস বলে না। কারণ, আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের একমাত্র সংগঠন যেটি তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই তৃণমূলই আওয়ামী লীগের শক্তি। যে কোনো সংকটে এরা রুখে দাঁড়ায়। গত ১৩ বছরে আওয়ামী লীগের যেমন অনেক অর্জন আছে, তেমনি অনেক ব্যর্থতাও আছে। এই সময়ে আওয়ামী লীগে সুযোগ সন্ধানীদের মেলা বসেছে। আওয়ামী লীগার হয়ে অনেকে বেশুমার অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন। কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি অর্থ পাচার করে ব্যাংকগুলোকে প্রায় ফোকলা বানিয়ে দিয়েছেন। কিছু অযোগ্য দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্ত্রীর কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যর্থতা সত্ত্বেও গত ১৩ বছরে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগে একজন শেখ হাসিনা আছেন। যিনি অসম্ভব সাহসী, দূরদর্শী এবং জনদরদি। একজন নেতা একাই কি অসাধ্য সাধন করতে পারেন, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ শেখ হাসিনা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ দেশের সিংহভাগ মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করে। তাঁর ওপর আস্থা রাখে। এই মুহূর্তে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। এ দেশের বড় একটা জনগোষ্ঠী মনে করে, শেখ হাসিনা না থাকলে এই দেশ অচল হয়ে যাবে। মুখ থুবড়ে পড়বে। মৌলবাদীরা দেশটা শকুনের মতো ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাবে। বাংলাদেশ একটা আফগানিস্তান হয়ে যাবে। এ কারণেই এ দেশের মানুষ এসব আন্দোলনে গা মাখে না। সংকটে হতাশ হয়, কিন্তু ক্ষুব্ধ হয় না। আশায় বুক বাঁধে। এদের অধিকাংশ মানুষই মনে করে ‘অন্ধকার যতই গভীরে হোক, ভোর আসবেই’। একজন শেখ হাসিনা আছেন- এ জন্যই আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের মাধ্যমে হটানো যাবে না। চা শ্রমিক থেকে ভূমিহীন। খেতমজুর থেকে ব্যবসায়ী। নারী, পুরুষ, শিশু। সবার আস্থার জায়গার নাম শেখ হাসিনা। এ কারণেই সরকারের পতনের দাবিতে গণজোয়ার হয় না। এটা বিএনপির নেতারাও ভালো করে জানেন। দলীয় কর্মীদের সেøাগান আর ঝালমুড়ির উৎসবে সরকার পতন হয় না। জনগণ লাগে। বিএনপির আন্দোলনের কর্মী আছে, জনগণ নেই। একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আরেকটি উপায় আছে। অবৈধ পন্থা এবং ষড়যন্ত্র। যেভাবে ’৭৫-এ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। যেভাবে ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময় আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়াকে বিলম্বিত করা হয়েছিল। তাহলে আওয়ামী লীগের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে বলে কি বিএনপি নেতারা সেই ষড়যন্ত্রের বার্তাই দিচ্ছেন? নির্বাচন যেমন ক্ষমতাবদলের একমাত্র সাংবিধানিক পন্থা, তেমনি ‘নির্বাচন বন্ধ’ অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখলের সবচেয়ে বড় অসাংবিধানিক পথ। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন যেন না হয় সে জন্য একটি মহল তৎপর। বিএনপির হুমকি জাতীয় পার্টির অস্থিরতা, ১৪ দলের কারও কারও আহাজারি একসূত্রে গাঁথা। কিছুদিন আগে সুশীল সমাজের পন্ডিতগণ ঘোষণা করেছিলেন, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে। এখন তারা তাদের হৃদয় এবং মস্তিষ্ক উৎসর্গ করেছেন নির্বাচনে। আগামী নির্বাচন যেন না হয় সে জন্য নানারকম তৎপরতা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো কেন এত আগে থেকে নির্বাচন নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে? এসব কিছু ‘পাজল গেমে’র মতো। রাজনীতি এখন মাঠে নেই। দাবার ছকে বন্দি হয়ে গেছে। আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায় প্রাসাদ ষড়যন্ত্রেই এখন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার মহাপরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। বিএনপি নেতারা হয়তো সেই আশাতেই ‘পতন’ ‘পতন’ বলে চিৎকার করছেন। কিন্তু বারবার ষড়যন্ত্রে ক্ষতবিক্ষত শেখ হাসিনা এখন ষড়যন্ত্রের গন্ধ আগেই টের পান। এ জন্য জনগণকে আগাম সতর্কবার্তাও দিয়ে রেখেছেন। গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের কিছু মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র করে সরকার উচ্ছেদ এখন সহজ রেসিপি নয়। বলে-কয়েও ষড়যন্ত্র হয় না। মির্জা ফখরুল ইসলাম ষড়যন্ত্রের সেই পুরনো খেলায় মগ্ন হয়ে গেছেন। রাস্তায় জ্বালাও-পোড়াও হবে। আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হবে। তৃতীয় শক্তি ক্ষমতা নেবে। হরতাল-অবরোধ যেমন আন্দোলনের অস্ত্র হিসেবে অচল হয়েছে, তেমনি ষড়যন্ত্রের এই ফর্মুলাও বস্তাপচা হয়ে গেছে। কিন্তু আমার শঙ্কা মির্জা ফখরুল এবং বিএনপি নেতাদের নিয়ে। আগে তারা রোজার পর, ঈদের পর, শীতের পর, বর্ষার পর আন্দোলনের ঘোষণা দিতেন। এখন তারা সরাসরি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঘোষণা দিচ্ছেন। শীত-বসন্তে যেমন আন্দোলন হয়নি, তেমনি যদি এবার আগাম ঘোষণাতেও সরকারেরও পতন না হয় তাহলে তারা আর রাজনীতিবিদ থাকবেন কি? ইরাকের সাইদ আল সাহাফকে শেষ দিকে বলা হতো ‘কমিক আলি’ (বাগদাদ বব)। মির্জা ফখরুলের মতো ব্যক্তিরা যদি শেষ পর্যন্ত তেমন উপাধি পান তাহলে রাজনীতির কী হবে?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

আওয়ামী লীগ   সরকারের   পতন   হচ্ছে কবে?  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

জলিলের ‘ট্রাম্পকার্ড’, বেগম জিয়ার ‘গৃহত্যাগ’, ফখরুলের ‘লালকার্ড’

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। আমাদের অহংকারের মাস। গৌরবের মাস। ডিসেম্বর, ফেব্রুয়ারি, মার্চ- এই তিনটি মাস নিয়ে আমাদের অনেক আবেগ। এই তিন মাস উৎসবমুখর থাকে বাংলাদেশ। নানা অনুষ্ঠানে, বর্ণিল আয়োজনে আমরা স্মরণ করি আমাদের অর্জন, এগিয়ে যাওয়াকে। কিন্তু এবারের ডিসেম্বর মাসটা যেন অন্যরকম। কিছুটা অস্বস্তির, খানিকটা আতঙ্কেরও বটে। ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকার মহাসমাবেশ ঘিরে রাজনীতিতে একটা উত্তেজনা লক্ষ্য করছি। এমনিতেই দেশের মানুষ টানাপোড়েনের মধ্যে আছেন। আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে ১০ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে হুমকি-পাল্টা হুমকিতে জনগণ খানিকটা বিস্মিতও বটে। বিএনপি কিছুদিন ধরে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করছে। সমাবেশগুলো বিএনপিকে উজ্জীবিত করেছে। এসব সমাবেশ করে বিএনপি মনে করছে সরকার পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এমনকি দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সরকার পরে পালানোর পথ পর্যন্ত পাবে না।কিন্তু এরকম একশটা সমাবেশ করে কি সরকার পতন ঘটানো যায়? বিএনপির এসব সমাবেশকে কি আন্দোলন বলা যায়? এসব আন্দোলনে কি জনগণ সম্পৃক্ত হয়েছে? বাংলাদেশে আন্দোলন, সংগ্রাম সবচেয়ে ভালো বুঝতেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তিনি বেড়ে উঠেছেন। জনগণকে উদ্বেলিত করেছেন। অধিকারহারা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। আন্দোলনের মাধ্যমেই তিনি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। আন্দোলন সম্পর্কে ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন। ওইদিন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনিআন্দোলনকীভাবে গড়ে তুলতে হয় তা পাঠদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আন্দোলন গাছের ফল নয়। আন্দোলন মুখ দিয়ে বললেই করা যায় না। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে হয়। আন্দোলনের জন্য আদর্শ থাকতে হয়। আন্দোলনের জন্য নিঃস্বার্থ কর্মী থাকতে হয়। ত্যাগী মানুষ থাকা দরকার। আর সর্বোপরি জনগণের সংঘবদ্ধ এবং ঐক্যবদ্ধ সমর্থন থাকা দরকার।

আন্দোলন গড়ে তোলার এই বুনিয়াদি শিক্ষা যদি আমরা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখি তাহলে দেশেআন্দোলনহচ্ছে কি না তা বুঝতে আমাদের সুবিধা হবে। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে কি পেরেছে? বিএনপির সমাবেশগুলো নেতা-কর্মীদের বিরিয়ানি-খিচুড়ির উৎসব। সাধারণ জনগণ নিরাপদ দূরত্বে। বিএনপির আন্দোলনের ইস্যু কী? নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। নিয়ে কি জনগণের মাথাব্যথা আছে? বিএনপি বলছে, সরকার নাকি দেশকে দেউলিয়া বানিয়ে ফেলেছে। কদিন আগে বিএনপির মাঝে মাঝে উদয় হওয়া এক নেতা, দাঁত চিবিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার চেয়েও খারাপ।তাই নাকি? তাহলে শ্রীলঙ্কার জনগণের মতো বাংলাদেশের মানুষ তো রাস্তায় নামছে না। অর্থাৎ বিএনপি তাদের বক্তব্যের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো জনমত সৃষ্টি করতে পারেনি।জনগণ আমাদের সঙ্গেবলে তাদের চিৎকার দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে প্রহসন। বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনের দ্বিতীয় শর্ত হলোআদর্শ বিএনপির আদর্শ কী, নিয়ে বিএনপির নেতাদের মধ্যেই নানা বিস্ময়। জিয়ার আদর্শ ছিলরাজনীতি ডিফিকাল্ট করে দাও।’ 

রাজনীতিতে কালো টাকা, লুটেরা ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, স্বাধীনতাবিরোধীদের সমন্বয়ে এমন এক ককটেল জিয়া আবিষ্কার করেছিলেন যে, এখন রাজনীতি সত্যিই ডিফিকাল্ট হয়ে গেছে। সৎ নিষ্ঠাবান আদর্শবাদীদের জন্য আজ রাজনীতি এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা। এটা এখন শুধু বিএনপির জন্য নয়, সব দলের জন্য প্রয়োজন। জিয়ার পর বিএনপির নেতৃত্বে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। বেগম জিয়ার আদর্শ ছিলসবার আগে পরিবার ফ্যামিলি ফার্স্ট। তিনি তার গৃহবধূ বোনকে মন্ত্রী বানিয়েছেন। প্রয়াত অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ভাইকে এমপি এবং ছায়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী বানিয়েছিলেন। নিজ পুত্রকেরাজপুত্রহিসেবে অভিষিক্ত করেছিলেন। এমনকি চাকর-বাকর, পাইক-পেয়াদাদেরও এমপি, রাজনৈতিক সচিব বানাতে কার্পণ্য করেননি। পরিবারের সবার তো বটেই এমনকি পরিবারের ফাই ফরমাশ খাটাদেরও হাজার কোটি টাকার মালিক বানিয়ে দিয়েছেন। পরিবার ভালো থাকলেই দল ভালো থাকবে। দল ভালো থাকলেই দেশ ভালো থাকবে। এটাই ছিল বেগম জিয়ার আদর্শ। এই ফ্যামিলি ফার্স্ট নীতি থেকে তারেক জিয়ার রাজত্বে বিএনপি কিছুটা সরে এসেছে। বর্তমানে বেগম জিয়া বিএনপির নামমাত্র প্রধান। আসল ক্ষমতার মালিক হলেন তারেক জিয়া। তারেক জিয়ার বিএনপির আদর্শ হলোমানি ফার্স্ট যা কিছু কর সবার আগে টাকা লাগবে। নির্বাচন, আন্দোলন, কমিটি, লবিং, অপপ্রচার সবকিছুতেই মানি ফার্স্ট। সবার আগে টাকা। এই আদর্শ বিএনপিতে সংক্রমিত হয়েছে ভালোভাবেই। বিএনপি এখন মোটামুটি আর্থিক দিক থেকে আত্মনির্ভরশীল দলে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরাই দাবি করেন যে, টাকা না দিলে বিএনপির কোনো পর্যায়ের কমিটিতেই থাকা যায় না। কিছুদিন আগে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ছাত্রদলের কমিটি ঘোষিত হয়েছিল। পদবঞ্চিতরা কে কত টাকায় কোন পদ পেয়েছেন তার এক ফিরিস্তি প্রকাশ করেছিলেন গণমাধ্যমে। টাকার অঙ্ক দেখে আমার বিশ্বাস হয়নি। এক বিএনপি নেতাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই এসব নিশ্চয়ই গুজব তাই না। গুজবে দেশটা ভরে গেছে।তিনি কানের কাছে মুখটা আনলেন। হাত দিয়ে আমার কানটা ঢেকে যা বললেন তাতে তো আমার ভিরমি খাওয়ার অবস্থা। তার মতে, বিএনপির থানা কমিটিতেও কোটি টাকার খেলা হয়।মানি ফার্স্টনীতিতে বিএনপি উজ্জীবিত। জন্য নেতারাও এখন নিজেদের দৃশ্যমান রাখতে সচেষ্ট। বিভিন্ন সেমিনার, গোলটেবিল থেকে সমাবেশে গরম বক্তৃতা দেন। তাদের কদর বাড়ে। কর্মীরা আসে। পদ চায়, সঙ্গে নগদ নজরানা। বিএনপির আদর্শ আসলে কী? বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জ্বালানি নীতি কী হবে? পররাষ্ট্রনীতি কী হবে? আর্থিক ব্যবস্থাপনার কী পরিবর্তন আনবে। ঋণখেলাপির লাগাম কীভাবে টেনে ধরা হবে। অর্থ পাচার বন্ধে বিএনপির পদক্ষেপ কী হবে? এসব নিয়ে বিএনপির কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা কৌশলপত্র দৃশ্যমান নয়। বিএনপি নেতারা সরকারের ঢালাও সমালোচনা করছেন। সব খারাপ বলতে বলতেই বিএনপি নেতারা তাদের ক্ষমতাকালীন সময়ের দুষ্কর্মও বেমালুম ভুলে গেছেন। কিছুদিন আগে যখন বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি হলো তখন তাদের নেতারা বিদ্যুৎ সংকটের জন্য সরকারকে তুলাধোনা করলেন। কিন্তু তারা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন বিদ্যুতের ভয়াবহতা নিয়ে কিছুই বললেন না। এখন বিএনপি নেতারা অর্থ পাচার নিয়ে অনেক কথা বলছেন। কিন্তু বাংলাদেশে অর্থ পাচারের আবিষ্কারক যে তাদের নেতা, এই সত্যটা সাহস করে স্বীকার করলেন না। তিনবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ বিএনপি-জামায়াত জোট জামানায়। সেই দল যখন প্রতিপক্ষকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে তখন রবীন্দ্রনাথের পঙ্ক্তি নিজের অজান্তেই ঠোঁটে এসে যায়তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ আমি চোর বটে তাই আদর্শহীন একটি রাজনৈতিক দল (কিংবা ক্লাব) আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে কীভাবে, প্রশ্ন অনেকের। বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন সূত্রের আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হলো নিঃস্বার্থ কর্মী। নিয়ে আমি বেশি কিছু লিখতে চাই না। গত শনিবার কুমিল্লায় বিএনপির সমাবেশ হলো। পত্রিকার খবরে দেখলাম, রুমিন ফারহানাসহ বিএনপির ৩০ নেতার মোবাইল চুরি হয়েছে। এটা কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কে বা কারা মোবাইল চুরি করেছে। যে দলের নেতাদের ফোন বা মূল্যবান সামগ্রী কর্মীদের কাছে নিরাপদ নয়, সেই দলের কর্মীদের আর যাই বলা হোক না কেন নিঃস্বার্থ বলা যাবে না। এখন তারা নেতাদের মোবাইল চুরি করছে। ক্ষমতায় গেলে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল সব খেয়ে ফেলবে। কাজেই আন্দোলন গড়ে তোলার বৈশিষ্ট্যগুলোকে এখন পর্যন্ত ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি একবিন্দুতে মেলাতে পারেনি। হুংকার কিংবা ধমক দিয়ে আত্মতৃপ্তি হয়। কিন্তু আন্দোলন হয় না। বিএনপি যে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ঢাকায় সমাবেশের স্থান নিয়ে অযাচিত, অপ্রাসঙ্গিক উত্তাপ ছড়ানো। নয়াপল্টনেই কেন জনসভা করতে হবে? ব্যাপারে বিএনপি নেতাদের ব্যাখ্যার কোনো যুক্তি নেই, জেদ আছে। যে কোনো মূল্যেই নয়াপল্টনে জনসভা করব। সরকার অনুমতি দিক না দিক পল্টনেই সমাবেশ হবে- ইত্যাদি কথা রাজনীতির ভাষা নয়। পল্টনে যে কোনো মূল্যে সমাবেশ করতে বিএনপি নেতারা বদ্ধপরিকর। তাহলে সমাবেশের অনুমতি চাইতে তারা ঢাকার পুলিশ কমিশনারের কাছে গিয়ে ফটোসেশন করলেন কেন? বিএনপির যদি এতই জনসমর্থন তাহলে সমাবেশের জন্য তাদের পুলিশের দ্বারস্থ হতে হবে কেন? যেখানে ইচ্ছা যখন খুশি সমাবেশ করবে। বিএনপি যদি সত্যি বিশ্বাস করে তাদের সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হবে। সে ক্ষেত্রে তো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাদের সমাবেশে আরও উৎসাহিত হওয়া উচিত। তাহলে কি বিএনপি গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে চাচ্ছে? ১০ ডিসেম্বরকে ঘিরে ঢাকায় একটা বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। পুলিশ কিংবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির সংঘর্ষ হবে। কয়েকজন মারা যাবেন। ব্যস, আন্দোলন বারুদের মতো জ্বলে উঠবে। এমন শর্ট-কাট পথে কি বিএনপি আন্দোলনে জয়ী হতে চায়? আমার তেমনটি মনে হয় না। আমার বরং মনে হয়, আন্দোলনের এই খেলায় বিএনপি আসলে পুতুল নাচের পুতুল মাত্র। বিএনপির আন্দোলনের সুতো অন্য কারও হাতে। কিংবা বিএনপির অবস্থা ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়াগণি মিয়ারমতো।গণি মিয়া একজন কৃষক। নিজের জমি নাই। অন্যের জমিতে চাষ করে।বিএনপি তেমনি অন্যের জন্য একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। কারও ঘরে ফসল তুলে দেওয়ার জন্য কেউ বা কারা যেন বিএনপিকে ভাড়া করছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে যাক-এটাই যেন বিএনপির একমাত্র চাওয়া। আওয়ামী লীগ সরে গিয়ে তৃতীয় শক্তিকে আনার সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বিএনপি? বিএনপির আন্দোলনের সুতো আসলে কার হাতে? বাংলাদেশ এখন গুজবের দেশে পরিণত হয়েছে। কান পাতলেই নানা গুজব শুনি। ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। গত বছর ওইদিনেই ্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। বিএনপির সমাবেশ নিয়ে মূল মনোযোগ সবার। কিন্তু অলক্ষ্যে কি ১০ ডিসেম্বর অন্য কোনো ঘটনা ঘটবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর কয়েকটি মূলধারার গণমাধ্যম এখন প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের ব্যর্থতার গুজব এবং অর্ধসত্য তথ্য প্রচার করে সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। এই অপপ্রচার এখন প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। কূটনৈতিকপাড়ায় এখন প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও চা-চক্র, ককটেল পার্টি কিংবা নৈশভোজের জমজমাট আয়োজন। সুশীলদের মলিন মুখে এখন হালকা হাসির রেখা। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে সংঘাত, হানাহানি লাগিয়ে কি কোনো তৃতীয় পক্ষ ফায়দা লুটতে চায়? আমলাদের মধ্যেও এখন সুবিধাবাদীরা নিরপেক্ষ সাজার মহড়া দিচ্ছেন। গোপনে সরকারের সমালোচনায় মুখর তারা। অতি উৎসাহী পুলিশের বাড়াবাড়ি, গায়েবি মামলা আসলে কার লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার? পর্দার আড়ালেই কি আসল খেলা চলছে? আবার কি এক-এগারোর মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির নীরব আয়োজন চলছে? এই প্রশ্নগুলো আমার মাথায় এসেছে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কৌশল এবং বক্তব্য দেখে। ছয় মাস ধরেই প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক শক্তিকে সামনে আনতে চাইছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।প্রধানমন্ত্রী বিরোধী আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়েছেন। ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ যেন নির্বিঘ্নে হতে পারে তার জন্য একাধিক উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রথমত, তিনি ছাত্রলীগের সম্মেলন দুই দিন এগিয়ে এনেছেন। যেন ১০ ডিসেম্বর বিএনপির সমাবেশের মাঠ প্রস্তুত থাকে। বিএনপি মঞ্চ নির্মাণসহ আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী বিএনপির সমাবেশ নির্বিঘ্ন করতে পরিবহন ধর্মঘট না ডাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। তৃতীয়ত, এই সমাবেশের পাল্টা কোনো সমাবেশ না দেওয়ার জন্যও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দলের নেতা-কর্মীদের বলেছেন। শুধু বিএনপির সমাবেশের জন্য সহায়তা নয়। শেখ হাসিনা নিজেও দেশকে সুষ্ঠু রাজনীতিমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছেন। যশোরে জনসভা, আগামী ডিসেম্বর চট্টগ্রামের জনসভা তার বড় প্রমাণ। রাজনৈতিক গোলযোগে বিরাজনীতিকরণের পক্ষের মতলববাজরা যেন ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে সে ব্যাপারে শেখ হাসিনা সতর্ক। কিন্তু তাঁর দল কি তাঁর কৌশল বোঝে? নাকি কৌশল বুঝেও অপতৎপরতা চালাচ্ছে? আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যখন পরিবহন ধর্মঘট না ডাকার পরামর্শ দিচ্ছেন তখন জাসদ থেকে আমদানিকৃতগরু ছাগল চিনলেই ড্রাইভার হওয়া যায়এমন তত্ত্বের আবিষ্কারক এক নেতা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে ধর্মঘটের নেপথ্যে মদদ দিচ্ছেন। এই ধৃষ্টতা তিনি কীভাবে দেখান? এই সাহস কোত্থেকে তিনি পান। এখনো আওয়ামী লীগের কিছু নেতা দেখে নেব, খেয়ে ফেলব বলে যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছেন কার স্বার্থে? এক-এগারো এসেছিল সুশীল এবং পশ্চিমার কিছু দেশের পরিকল্পনায়। কিন্তু এর বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলের কিছু সুবিধাবাদী, আদর্শ বিবর্জিত নেতার হাত ছিল। সেই সময় রাজনীতির মাঠে যারা সবচেয়ে যুদ্ধংদেহি ছিলেন এবং এক-এগারোতে তারাই সংস্কারপন্থি ভাঁড় সেজেছিলেন। এখনো কি ওই অতি উৎসাহীরা একই খেলা খেলছেন? ১০ ডিসেম্বর কী হবে? ২০০৪ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা আবদুল জলিল ট্রাম্পকার্ড তত্ত্ব হাজির করেছিলেন। ঘোষণা করেছিলেন ৩০ এপ্রিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পতন হবে। জন্য আওয়ামী লীগ লাগাতার বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল। ২১ এপ্রিল হাওয়া ভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ছিল। কিন্তু পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বনানী গুলিস্তান অবরুদ্ধ করে রাখে। ২৫ এপ্রিল স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা। ট্রাম্পকার্ড তত্ত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারও বিচলিত হয়েছিল। সময় তৎকালীন সরকার গণগ্রেফতার শুরু করে। ২৪ এপ্রিল থেকে আওয়ামী লীগ গণঅনাস্থা কর্মসূচি পালন করে। ২৮ এবং ২৯ এপ্রিল আওয়ামী লীগ ৪৮ ঘণ্টার হরতাল পালন করে। কিন্তু ৩০ এপ্রিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার থাকে বহাল তবিয়তে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০০৪ সালের ৩০ এপ্রিল ছিল বড় কৌতুক। এরকম কৌতুকের জন্ম দিয়েছিলেন বেগম জিয়াও। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে সরকারকে টেনেহিঁচড়ে নামাতে চেয়েছিলেন। ঘোষণা করেছিলেন গোপালগঞ্জ নামই পাল্টে দেবেন। ২০১৪-এর আন্দোলনে বেগম জিয়াগৃহত্যাগনাটক মঞ্চস্থ করেন। ২০১৩-এর জানুয়ারির নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বেগম জিয়া লাগাতার অবরোধের ডাক দেন।ফিরোজাথেকে বেরিয়ে আসেন গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে। ঘোষণা করেন তিনি ঘরে ফিরবেন না। সময় বেগম জিয়ার আন্দোলন নিয়েও অনেক কথাবার্তা হয়েছিল। আতঙ্কিত মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না। কিন্তু বেগম জিয়ারগৃহত্যাগনাটক ফ্লপ হয়। আজ অবধি বিএনপি ওই লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করেনি। বেগম জিয়ার ওই আন্দোলন বর্তমানে বিএনপির সমাবেশ নাটকের চেয়েও বড় পরিসরে ছিল। আন্দোলনের ব্যাপ্তিও ছিল ভয়ংকর। গাড়িতে গান-পাউডার দিয়ে মানুষ পোড়ানো। আগুন-সন্ত্রাস। নাশকতা। কী হয়নি সে সময়? কিন্তু সেই সময় সরকারের পতন হয়নি। তাই এবারও বিএনপির ঢাকা সমাবেশে কোনো দৈব বিপ্লব হবে না, এটা অনুমান করা যায়। আন্দোলন কোনো স্বপ্নে পাওয়া তাবিজ নয়। যা দিয়ে মুহূর্তেই মনের বাসনা পূরণ হবে। কিন্তু ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এখন ক্ষুধার্ত। তাই সরকারকে ১০ ডিসেম্বর লালকার্ড দেখানোর ঘোষণা দিয়েছে। এই লালকার্ড কি ট্রাম্পকার্ডের মতোই হবে? কিন্তু ১০ ডিসেম্বর ষড়যন্ত্রের টানেল খুলে দিতে পারে। তৃতীয় শক্তির ক্ষমতায় আসার পথ তৈরির সূচনা হতে পারে। বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত ১০ ডিসেম্বর সহিংসতাকে উসকে দেয়। আওয়ামী লীগে ঘাপটি মেরে থাকা হাইব্রিড, সুবিধাবাদী এবং ষড়যন্ত্রকারীরা যদি বিএনপির সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, তাহলে ষড়যন্ত্র ভয়ংকর হয়ে উঠবে। ১০ ডিসেম্বর রাজনীতিতে সহিংসতার আগুন লাগলে, সে আগুন সব খানে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত কুশীলবরা। তাই, শেখ হাসিনার নির্দেশনা মানতে হবে আওয়ামী লীগকে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। সতর্কতার সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। না হলে বিরাজনীতি এবং অপরাজনীতির ষড়যন্ত্রের কাছে হেরে যাবে রাজনীতি এবং গণতন্ত্র।  বিএনপি সেই ফাঁদে পা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ কি পারবে দূরে থাকতে?



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

শেখ হাসিনার ম্যাজিক: চুপসে গেছে ষড়যন্ত্রকারীরা

প্রকাশ: ০৭:৫৮ পিএম, ০২ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

আবারও শেখ হাসিনার ম্যাজিক। বাংলাদেশের রিজার্ভ কমে যাচ্ছে, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাবে, সামনে মহাসংকট ইত্যাদি অপপ্রচার যারা করছিল। এবং এই অপপ্রচারের সুযোগে রাজনীতিতে উত্তেজনা এবং সহিংসতা সৃষ্টির যে নীলনকশা রচিত হয়েছিল তা হঠাৎ করেই চুপসে গেছে। নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে। একদিকে রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে তিন মাসের মধ্যে নভেম্বরে সর্বোচ্চ রেমিটেন্স এসেছে ১৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যে সংকটের কথা বলা হচ্ছিল তার কেটে গেছে। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে ধানের উৎপাদনের বাম্পার ফলন হয়েছে এবং বাংলাদেশের খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক। ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছে। 

গত দুই মাস ধরে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলার জন্য একের পর এক দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বারবার তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। যার ফলে এখন বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এর ফলে ষড়যন্ত্রকারীরা আবার কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে পাঁচটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। 

প্রথমত, ব্যয় সংকোচন নীতি বা কৃচ্ছ্বতা সাধণ নীতি। এর ফলে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সবক্ষেত্রে ব্যয় হ্রাসের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনার ফলে এখন আমাদের অর্থনীতির ওপর অনেকটাই চাপ কমেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন নীতির সুফল বাংলাদেশ পেতে শুরু করেছে।

দ্বিতীয়ত, তিনি অর্থ পাচারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এবং এর ফলে এখন যেভাবে খুশি এলসি খোলার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থানে গিয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন যে, ১০০ এলসি তিনি বন্ধ করেছেন, যেগুলোতে আশ্চর্যজনকভাবে ওভার ইনভয়েসিং হয়েছিল। ওভার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে অর্থপাচারের যে কৌশল সেটির লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। ফলে আমাদের আমদানি অযাচিত আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এর উপর চাপ কমেছে।

তৃতীয়ত, শেখ হাসিনা হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যাপারে কঠোর হওয়া এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তার সুফলও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে। হুন্ডির ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি এবং কঠোর বিধিনিষেধের ফলে নভেম্বর মাসে রেমিটেন্স প্রবাহ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, রেমিটেন্স এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এর উপর যে চাপ সেই চাপ অনেকটাই কমিয়ে তুলতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

চতুর্থত, শেখ হাসিনা খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির উপর নজর দিয়ে ছিলেন এবং তিনি এক ইঞ্চি জমিও যেন খালি না থাকে সেই নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তার সুফল এখন বাংলাদেশে পাচ্ছে, ধানের ফলন বাম্পার হচ্ছে। সামনের মৌসুমগুলো আরও উৎপাদন বাড়বে এবং বাজারের বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ে যে আহাজারি ছিল সেটিও কমে গেছে। 

পঞ্চমত, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্র প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত পদক্ষেপের ফলে বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমে গেছে। এবং সামনে অনেকগুলো নতুন বিদ্যুৎ সঞ্চালন কেন্দ্রের চালু হতে যাচ্ছে। যার ফলে বিদ্যুৎ সংকট বাংলাদেশকে কাহিল করতে পারবে না। ফলে শেখ হাসিনার ম্যাজিক আবার দেখল বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে ঘিরে এবং সরকারকে উৎখাতের যে নীলনকশা রচিত হয়েছিল তা এখন পিছু হটতে বাধ্য হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

পরিকল্পনা ছিল যে, অর্থনৈতিক সংকট যতই বাড়বে তাকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করা হবে এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকারকে কুপোকাত করা হবে। কিন্তু শেখা ম্যাজিকে তা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে।

শেখ হাসিনা   ম্যাজিক  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

পর্দার আড়ালে খেলছে কারা?

প্রকাশ: ০৯:০০ পিএম, ২৯ নভেম্বর, ২০২২


Thumbnail

দেশের অন্যতম শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো। প্রথম আলো রাস্তা বন্ধ করে জনসমাবেশ করার ঘোরতর বিপক্ষে। এ নিয়ে দিনের পর দিন তারা প্রতিবেদন তৈরি করেছে, কলাম লিখেছে। এ নিয়ে জনভোগান্তি হয়, রাস্তায় তীব্র যানজট হয় তা নিয়ে প্রথম আলোর যেন বিরামহীন প্রচারনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই আজ ঘুরে গেল প্রথম আলো। ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির জনসভাস্থল নিয়ে বিএনপির চেয়েও বেশি দুঃখিত যেন প্রথম আলো। প্রথম আলো আজ এ নিয়ে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রথম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপিকে আরও চাপে ফেলতে চায় আওয়ামী লীগ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জমায়েত পূর্ণ করতে হলে বেশ বেগ পেতে হবে বিএনপিকে। আর না পারলে বিএনপির জনসমর্থন নেই এই প্রচার করতে পারবে আওয়ামী লীগ। এই প্রতিবেদনে এটাও বলা হয়েছে যে, বিএনপিকে চাপে ফেলার জন্যই নাকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভা অনুমতি দিয়েছে পল্টনে নয়। 

এ সংক্রান্ত দ্বিতীয় প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। যার শিরোনাম হলো ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি, ফাঁদ মনে করছে বিএনপি’। এই প্রতিবেদনে শুরুতে বলা হয়েছে রাজধানীর নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে চায় বিএনপি। তবে হঠাৎ এই সমাবেশের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাম প্রস্তাব করে সেখানে ছাত্রলীগের পূর্বনির্ধারিত সম্মেলন বিএনপির জন্য দুদিন এগিয়ে আনা এবং মঞ্চ গুটিয়ে নেওয়ার আশ্বাস কৌতূহল সৃষ্টি করেছে দলের। এটা কি সরকারের উদারতা নাকি নতুন কোন ফাঁদ তা নিয়ে নানামুখী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। এসবের মধ্যে ঢাকায় সমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। অর্থাৎ এই প্রতিবেদন দুটি পুরোটা পড়লে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, প্রথম আলো গ্রুপ চাইছে রাস্তা বন্ধ করে ঢাকা শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশ হোক। বিএনপির সমাবেশ যদি করা হয় তাহলে রাস্তা বন্ধ করা জায়েজ আর অন্য কোনো রাজনৈতিক দল রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ করলে সেটা মহা অন্যায়? 

বিএনপির প্রতি এই সহানুভূতির কারণ কি? প্রথম আলো গ্রুপ সুশীল সমাজ নিয়ন্ত্রিত একটি পত্রিকা। আওয়ামী লীগ-বিএনপির গোলযোগ হোক, রাস্তায় সহিংসতা হোক, রক্তাক্ত হোক তাহলেই সুশীল সমাজের ক্ষমতা গ্রহণের পথ তৈরি হয়ে যায়। এটিই এখন রাজনীতির মূল পরিকল্পনা। পর্দার আড়ালে এই খেলাটি চলছে। বিএনপিকে সুশীলদের কেউ কেউ উৎসাহিত করছে, উদ্বেলিত করছে, যেমন প্রথম আলো। এরকম অনেক সুশীলই বিএনপিকে কোন অবস্থাতেই নয়াপল্টন না ছাড়ার জন্য রীতিমতো তোষামোদি করছে। এর কারণ বিএনপি জানে যে, আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে যতক্ষণ পর্যন্ত সহিংসতা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সুশীলরা গ্রিন রুম থেকে মূলমঞ্চে আসতে পারবেন না। আর সে কারণেই সুশীলরা যেন গ্রিন রুমে আসতে পারেন সেজন্য পর্দার আড়ালে খেলা শুরু হয়ে গেছে। পর্দার আড়ালে সুশীলরা খেলছেন এবং বিএনপিকে উত্তপ্ত  করার চেষ্টা করছেন। 

গত কিছুদিন ধরেই সুশীল সমাজ বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে, রিজার্ভের টানাপোড়েন, লোডশেডিং বাড়তেই থাকবে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে টাকা নেই ইত্যাদি প্রচারণা করে সরকারকে অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রায় দেউলিয়া প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে। আবার মানবাধিকার নিয়েও সুশীলরা আন্তর্জাতিক মহলের পশ্চিমা দেশগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সরকারকে দুর্বল করে তোলা আর মাঠে বিএনপিকে নামিয়ে একটা সহিংসতা উত্তেজনা তৈরি করা। তাহলে আরেকটা ওয়ান-ইলেভেন তৈরি করা যাবে। 

ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানেন যে, এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে তার অর্থ পাচারের মামলার তদন্ত হবে এবং তিনি ফেঁসে যাবেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং প্রথম আলো-ডেইলী স্টার গ্রুপ তারাও জানেন যে, এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাদের দাপটটা থাকবে না। এ কারণেই পর্দার আড়ালে তারা নেমেছেন। একদিকে যেমন পশ্চিমা দেশগুলোকে দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপিকে রক্তাক্ত আন্দোলনের জন্য উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। পর্দার আড়ালের এই খেলার পরিণতি শেষ পর্যন্ত কি হয় সেটাই দেখার বিষয়।

প্রথম আলো   সুশীল সমাজ   বিএনপি   ১০ ডিসেম্বর  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মেসি একা পারেননি, শেখ হাসিনা কি পারবেন?

প্রকাশ: ০৯:৫৯ এএম, ২৬ নভেম্বর, ২০২২


Thumbnail

দিলীপ বড়ুয়া একজন ভাগ্যবান রাজনীতিবিদ। বাম রাজনীতি করলেও ক্ষমতার চারপাশেই তার আনাগোনা। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার সফরসঙ্গী হয়ে চীন সফর করেছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তার সাম্যবাদী দলের তিনিই সর্বেসর্বা। কর্মী নেই, আসন নেই তবু তিনি মন্ত্রী হওয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগ একলা চলো নীতিতে।  এ কারণে বামপন্থি ওই নেতা অপাঙ্ক্তেয়। অনাদরে-অবহেলায় পরিত্যক্ত সরঞ্জামের মতো পড়ে আছেন। এরকম কষ্টে থাকলে তো যে কারোরই মন খারাপ হওয়ার কথা। দিলীপ বড়ুয়ারও হয়েছে। এ কারণেই ক্ষোভ ঝেড়ে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিবিসিতে। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় আন্তর্জাতিক সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে সুষ্ঠু নির্বাচনে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্লোগানের মধ্য দিয়ে আদৌ নির্বাচন না-ও হতে পারে।’ বড়ুয়া একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপারে তার অভিমানের কথা যেমন বলেছেন, ঠিক তেমনি নির্বাচন নিয়ে তিনি যে শঙ্কার কথা বলেছেন, সেটি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামীর শঙ্কার বিষয়টা তিনি অকপটে এবং খোলামেলাভাবে বলেছেন।

বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হওয়ার কথা। এক বছর দুই মাস আগে থেকেই নির্বাচন নিয়ে রাজনীতির মাঠ আস্তে আস্তে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচন নিয়ে খোলামেলা কথাবার্তা বলছে। নির্বাচন নিয়ে সুশীল সমাজের ঘুম নেই। নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে, গাইবান্ধার মতো নির্বাচন রুখতে তারা বদ্ধপরিকর। সবার উদ্যোগ, আয়োজন, উৎকণ্ঠা এবং কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নয়। আগামী নির্বাচন বানচাল করাই যেন একটি সম্মিলিত শক্তির প্রধান লক্ষ্য। আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর প্রধান এবং অব্যর্থ অস্ত্র যেন নির্বাচন হতে না দেওয়া। এমনকি আগামী সংসদ নির্বাচন যেন না হয়, সে জন্য ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ তৎপর। প্রশাসনের মধ্যেও ঘাঁপটি মেরে আছে নির্বাচন বানচাল করার অপশক্তি। তর্কের খাতিরে আমরা যদি ধরে নিই শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হলো না, তাহলে কী হবে? 

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী পাঁচ বছর অন্তর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এই নির্বাচন না হলে দেশে একটি সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। অসাংবিধানিক শক্তি ক্ষমতায় আসার সুযোগ পাবে। আবার সংবিধান কাটাছেঁড়া হবে। অগণতান্ত্রিক এবং অনির্বাচিত একটি সরকার জগদ্দল পাথরের মতো জনগণের বুকের ওপর চেপে বসবে। সে রকম একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যই কি সমন্বিত প্রয়াস? আবার কি দেশে একটি এক-এগারো আনার পাঁয়তারা চলছে?

গত তিনটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সেরা নির্বাচন। ২০১৪-এ বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে নির্বাচন বর্জন করে। অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। জাতীয় পার্টি আংশিক রঙিন সিনেমার মতো ওই নির্বাচনে আংশিক অংশগ্রহণ করে। কিন্তু বিএনপি ওই নির্বাচন প্রতিরোধ করতে পারেনি। বাংলাদেশে ২০১৪ সালের মতো প্রধান প্রধান দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন হয়েছে মোট চারটি। ১৯৮৬ সালের ৭ মের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে অংশ নেয়। নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টির নেতা সামরিক একনায়ক এরশাদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা বন্ধ করে দেন। তারপর বানোয়াট ফলাফল বেতার এবং টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। ওই নির্বাচনকে বলা হয় মিডিয়া ক্যু-এর নির্বাচন। ’৮৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের আয়ু ছিল মাত্র দেড় বছর। ১০ জুলাই সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। ১৯৮৭ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি তীব্র বিরোধী আন্দোলনের মুখে সংসদ বিলুপ্ত করেন। ১৯৮৮-এর ৩ মার্চের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি কোনো দলই অংশ নেয়নি। আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে কিছু রাজনৈতিক ভাঁড়কে নিয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল এবং জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনিদের ফ্যাসিস্ট দল ফ্রীডম পার্টি ওই নির্বাচনে অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে কোনো ভোট হয়নি। বানোয়াট ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ২৫ এপ্রিল ১৯৮৮-তে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। ’৯০-এর ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে এই সংসদ বিলুপ্ত হয়। প্রধান সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। মাগুরা, মিরপুর উপনির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপির পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। সে সময় বিএনপি বলেছিল, ‘পাগল এবং ছাগল ছাড়া কেউই নিরপেক্ষ নন।’ তীব্র গণআন্দোলন উপেক্ষা করে বেগম জিয়া নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতসহ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচন বর্জন করে। প্রতিরোধের ডাক দেয়। বিএনপি ছাড়া আত্মস্বীকৃত খুনিদের দল ফ্রীডম পার্টি ওই নির্বাচনে অংশ নেয়। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ’৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি আসলে কোনো ভোট হয়নি। নির্বাচনে বিএনপির ৪৯ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভোট ছাড়াই কমিশন বিএনপি এবং ফ্রীডম পার্টির মধ্যে আসন বণ্টন করে একটি ভৌতিক ফলাফল ঘোষণা করে। এটা করতেই কমিশনের সময় লাগে পাঁচ দিন। গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কোনো রকমে ১৯ মার্চ রাতে সংসদ অধিবেশন বসানো হয়। এই সংসদের আয়ু ছিল মাত্র সাত দিন (চার কর্মদিবস)। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করেই এই সংসদ বিলুপ্ত হয়। প্রধান যে কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া সংসদ তার মেয়াদপূর্তি করতে পারে না- এরকম একটি ধারণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৪-তে বিএনপির ভোট বর্জনের পক্ষে প্রধান প্রেরণা ছিল এই সূত্রই। শুধু বিএনপি কেন, আওয়ামী লীগেরও অধিকাংশ নেতা এবং প্রার্থী মনে করেছিলেন, এই নির্বাচন একটি আপৎকালীন ব্যবস্থা। দ্রুতই আরেকটি নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ জন্য আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে বিনা ভোটে জয়ী হওয়ার হিড়িক পড়ে। নির্বাচনের প্রচারণা এবং টাকা খরচ করা থেকে আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ প্রার্থীই বিরত থাকেন। অল্প কিছু টাকা দিয়ে প্রতিপক্ষকে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। কোথাও কোথাও প্রশাসনকে ব্যবহার করে হুমকি দিয়েও প্রতিপক্ষকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে দেড় শর বেশি আসনে ভোট হয়নি। যেসব স্থানে ভোট হয় সেখানেও ভোটারদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল না। ওই নির্বাচনের পর এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটে গঠিত সংসদ তার মেয়াদপূর্ণ করে। এটার কারণ ছিল, বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতি। এ দেশের জনগণ বিএনপির জ্বালাও- পোড়াও এবং ধ্বংসাত্মক রাজনীতির বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়েছিল ওই নির্বাচনকে মেনে নিয়ে। অবশ্য এর পেছনে আরেকটি ব্যাপার ছিল। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগের সুশাসন, উন্নয়ন। জনগণের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আসছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হচ্ছিল। মানুষ পরিবর্তনে সায় দেয়নি। অনিশ্চয়তার সাগরে ঝাঁপ দিতে চায়নি। ২০১৮-এর নির্বাচন ছিল আওয়ামী লীগকে কলঙ্কিত করার ষড়যন্ত্র। ওই নির্বাচন যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুষ্ঠু নির্বাচনও হতো তবু আওয়ামী লীগ জিতত। ২০১৮-এর নির্বাচনে বিএনপি শর্তহীনভাবে অংশ নিয়েছিল। দলটির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। ড. কামাল হোসেনকে নেতা মেনে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল নিশ্চিত পরাজয় জেনেই। কিন্তু কিছু অতি উৎসাহী চাটুকার দলীয় সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করে। ওই নির্বাচনে যারা এটা করেছে, তারা আসলে গণতন্ত্রের শত্রু। ওই নির্বাচন সুন্দর হলে আজ এই সংকট হতো না। নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর এমন অতিকথনের সুযোগও থাকত না। এখন বিএনপি সুযোগ পেয়েছে। নির্বাচন বর্জনের নামে তারা একটি অসাংবিধানিক টানেলে বাংলাদেশকে নিতে চাইছে। এখন রাজনীতির আসল খেলা হচ্ছে নির্বাচন হওয়া না হওয়ার লড়াই। এখানে মাঠের লড়াই কেবল গ্যালারি শো। আসল খেলা হচ্ছে পর্দার আড়ালে। যেখানে আওয়ামী লীগ সব সময়ই আনাড়ি এবং অপরিপক্ব। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এখন প্রতিদিন ‘খেলা হবে’ সেøাগানের ব্র্যান্ডিং করছেন। শামীম ওসমান উদ্ভাবিত, পশ্চিম বাংলার মমতা ব্যানার্জি কর্তৃক বাজারজাতকৃত এই বহুল চর্চিত সেøাগান বারবার বলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক কোন খেলার কথা বলছেন? তিনি কি ভুল নিশানায় গুলি ছুড়ছেন? কারণ এবারের খেলাটা কে নির্বাচনে জিতবে তার প্রতিযোগিতা নয় বরং নির্বাচন করা না করার খেলা। সংবিধান রক্ষার খেলা। এই খেলায় কে জিতবে?

এখন বিশ্বকাপ জ্বরে কাঁপছে গোটা দেশ। সারা বিশ্ব। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে চলছে মাতামাতি। খেলা যেমন অনিশ্চয়তা, তেমনি রাজনীতিও। মঙ্গলবার একটা মিটিং শেষ করে অফিসে এলাম বিকাল ৪টা নাগাদ। অফিসে ঢুকেই দেখি হইচই। ঘটনা কী? জানলাম আর্জেন্টিনা-সৌদি আরব খেলা। এ জন্য আমার সহকর্মীদের এত উচ্ছ্বাস। জাস্টিন, রিফাতসহ আরও কয়েকজন আর্জেন্টিনার জার্সি পরে খেলা দেখছে। আর্জেন্টিনার সঙ্গে সৌদি আরবের যোজন-যোজন পার্থক্য। আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্য বিস্ময়কর। আর সৌদি আরবের বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলাটাই বড় অর্জন। এই খেলায় আর্জেন্টিনার জয় নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ ছিল না। দেখার বিষয় ছিল কত ব্যবধানে আর্জেন্টিনা জিতবে। পেলে, ম্যারাডোনার পর এই বিশ্বে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি। ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি। বিশ্বকাপের ট্রফিটা ছাড়া ফুটবলের এমন কোনো প্রাপ্তি নেই যা মেসি অর্জন করেননি। অনেক বোদ্ধা ক্রীড়া সমালোচক বলেন, মেসির জন্যই এবার আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ট্রফিটা জেতা উচিত। মেসি যদি একটা বিশ্বকাপ জয় না করতে পারেন, তাহলে সেটা হবে ফুটবলের দুর্ভাগ্য। বিশ্বকাপে আসার আগে টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। তাই তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের মিশনেই কাতারে এসেছে আর্জেন্টিনা। খেলা শুরুর পর মনে হচ্ছিল সৌদি আরবকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করবে বিশ্বের তৃতীয় ফুটবল শক্তির দেশটি। ১০ মিনিটে গোল করেন মেসি। স্পর্শ করলেন অনন্য রেকর্ড। টানা চার বিশ্বকাপে গোল করা গ্রেটদের এলিট ক্লাবে প্রবেশ করেন ফুটবলের জাদুকর। কিন্তু তখন কে জানত বিস্ময়ের অনেক বাকি। দ্বিতীয়ার্ধের ৫ মিনিটের ঝড়ে ল-ভ- হয়ে গেল মেসির আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম আপসেট জন্ম দিয়ে জিতল সৌদি আরব। প্রথম ম্যাচে একমাত্র লিওনেল মেসি ছাড়া আর সব আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়কে নিষ্প্রভ, মøান লেগেছে। মেসি নিঃসঙ্গ একাকী। সতীর্থরা মেসিকে মোটেও সহযোগিতা করতে পারছেন না। এই খেলাটা একটা ব্যাপার পরিষ্কার করে দিল, তা হলো খেলা এক মহাতারকার বিজয়গাথা নয়। একটি সমন্বিত টিমওয়ার্ক। যেখানে জেতার জন্য সবাইকে অবদান রাখতে হয়। খেলার মতো রাজনীতিতেও টিমওয়ার্ক লাগে। নেতার বিশ্বস্ত, পরীক্ষিত, যোগ্য সহযোগী লাগে। লাগে সমঝোতা, বোঝাপড়া এবং সমন্বয়। আর্জেন্টিনা-সৌদি আরব খেলা দেখে আমার মানসপটে বাংলাদেশের রাজনীতির চিত্রটা ভেসে উঠল। ওই খেলায় যেমন মেসি ছিলেন একা। তাকে তার সতীর্থরা সহযোগিতা করতে পারেননি। ঠিক তেমনি আমার মনে হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতেও শেখ হাসিনা একাকী। তাঁকে সহায়তা করার মতো যোগ্য লোক নেই সরকারে কিংবা দলে। টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার দেশ পরিচালনা করছে। ১৪ বছর বাংলাদেশ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই কৃতিত্ব একজনের, শেখ হাসিনার। তিনি দেশকে একাই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রথম এবং দ্বিতীয় মেয়াদে তাও কয়েকজন দৃশ্যমান সহযোগী ছিলেন। কিন্তু তৃতীয় মেয়াদে এসে মনে হচ্ছে শেখ হাসিনা একাই লড়ছেন।

একটি সরকারে প্রধানমন্ত্রীর পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন অর্থমন্ত্রী। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। বরিস জনসন তাকে অর্থমন্ত্রী (চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার) নিযুক্ত করেছিলেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে করোনাকালীন বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন। বিবিসির সঙ্গে তখন এক সাক্ষাৎকারে ঋষি বলেছিলেন, ‘বিশ্বে সবচেয়ে নিদ্রাহীন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং অসুখী ব্যক্তি হলেন একটি দেশের অর্থমন্ত্রী।’ ঋষি সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট। মঙ্গলবার তিনি গার্ডিয়ানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এই বিশ্বের কোনো অর্থমন্ত্রীর দম ফেলার সুযোগ নেই।’ জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন। অর্থমন্ত্রী (সেক্রেটারি অব ট্রেজারি) হিসেবে নিয়োগ দেন জ্যানেট ইয়েলেনকে। মার্কিন ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী অর্থমন্ত্রী। সম্প্রতি তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে জর্জরিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন পোস্টে এর পরিপ্রেক্ষিতে এক সাক্ষাৎকারে জ্যানেট ইয়েলেন বলেছেন, ‘এই দায়িত্বটা এমন যে, এক মুহূর্তও আপনি নিজের কথা ভাবতে পারবেন না।’ এই যখন দেশে দেশে অর্থমন্ত্রীদের অবস্থা তখন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর দর্শন প্রাপ্তিই যেন এক বিরাট খবর। যে কোনো সময়ে তার জন্য ‘নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি’ দেওয়া যেতেই পারে। সংকট উত্তরণে তিনি ভূমিকাহীন। কেন তিনি অর্থমন্ত্রী- এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো তিনি নিজেই দিতে পারবেন না। বাণিজ্যমন্ত্রীর বাজারের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি কখন কী বলেন, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী সরকারের জন্য কত বড় বোঝা তা নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেই ব্যাপক আলোচনা শোনা যায়। রেলমন্ত্রী তো তার নিজ নির্বাচনী এলাকাকেই রেলের সদর দফতর বানিয়ে ফেলেছেন। তার কিঞ্চিৎ পুরনো হওয়া নববধূর মন্ত্রণালয়ের কাজে হস্তক্ষেপের পরও তিনি এটাকে শপথ ভঙ্গ মনে করতে রাজি নন। এ নিয়ে তিনি পদত্যাগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখন সাংবাদিকতা শেখাচ্ছেন। এত বাচাল এবং অসংলগ্ন কথাবার্তা বলা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ কি আগে কখনো পেয়েছে? একা মেসি সৌদি আরবের সঙ্গেই হেরে গেছেন। এসব খেলোয়াড় (মন্ত্রী) দিয়ে শেখ হাসিনা কি পারবেন, ‘নির্বাচন বর্জন’ ষড়যন্ত্রকে হারাতে? এসব মন্ত্রী সামনে আরও বড় সংকটে কী করবেন? কিছু কিছু মন্ত্রী (সবাই নন) সরকারকে আরও ঝামেলায় ফেলছেন। কয়েকজনের কারণে সরকারের দুর্নাম হচ্ছে। মন্ত্রীদের যোগ্যতা, সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমরা যা জানি, তার চেয়ে বেশি জানেন শেখ হাসিনা। এ কারণেই তিনি মন্ত্রীদের ছেড়ে দিয়েছেন ফিতা কাটা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। কাজ করাচ্ছেন আমলাদের দিয়ে। বাড়ির কাজের সহায়তাকারী যদি একবার বুঝে ফেলে তাকে ছাড়া বাড়ির লোকজন অসহায়, তাহলে তাদের কেউ কেউ পেয়ে বসে। জি বাংলা, স্টার জলসা দেখার সময় থেকে শুরু করে সুগন্ধি সাবানের দাবি ওঠে। প্রতিদিন চাহিদার ফর্দ লম্বা হতেই থাকে। আমলারা যখন বুঝে গেলেন, মন্ত্রীরা ‘কচিকাঁচা’ (প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভাষা ধার করে) তখন কিছু কিছু আমলাও আবদারের তালিকাটা প্রতিদিন বাড়াচ্ছেন। এরা সরকারের সঙ্গে জনগণের মধ্যে দেয়াল তৈরি করছেন। রাজনীতি আর খেলার এক মৌলিক পার্থক্য আছে। ফুটবল বা ক্রিকেটে সমর্থকদের শুধু হাততালি দেওয়া কিংবা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করা ছাড়া কোনো ভূমিকা থাকে না। সমর্থকরা পছন্দের দলকে জেতাতে পারেন না। কিন্তু রাজনীতির খেলায় সমর্থকরাই আসল। সমর্থকরাই শক্তি। সমর্থকরাই দলকে জেতান। আর সমর্থক সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন সংগঠন এবং ভালো কাজ। সংগঠন শক্তিশালী হলেই সমর্থন বাড়ে। দল জনপ্রিয় হয়। আর সংগঠন না থাকলে বিশাল বড় নেতাও বিলীন হয়ে যান। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার নির্বাচনে আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মাহাথির মোহাম্মদের পরাজয় তার সবচেয়ে টাটকা উদাহরণ। ৫৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে মাহাথির প্রথম পরাজিত হলেন। জামানত হারালেন। কারণ তার সংগঠন ছিল না। নতুন রাজনৈতিক দলকে ঠিকঠাক মতো গড়ে তুলতে পারেননি ৯২ বছরের এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। আওয়ামী লীগ এখনো টিকে আছে, তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনের জন্যই। কিন্তু এখন যে জেলায়, উপজেলায় সম্মেলন হচ্ছে, তা কি মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের সংগঠন ঠিকঠাক আছে? নাকি সুবিধাবাদীর মতলববাজরা দখল করে নিয়েছে আওয়ামী লীগকে। সংগঠনে তারুণ্যের জয়ধ্বনি নেই। সেই বিতর্কিত পুরনো মুখরা আবার নেতৃত্বে আসছেন। এই সংগঠন কি নির্বাচনী খেলায় শেখ হাসিনাকে যোগ্য সহযোগিতা করতে পারবে? এই খেলা কঠিন হবে। এই খেলা ২০১৪ কিংবা ২০১৮-এর মতো হবে না। মাঠের খেলা আর রাজনীতির খেলায় একটি ব্যাপার হুবহু এক। মিরাকল। অনেক কিংবদন্তি একাই খেলার ভাগ্য পাল্টে দেন। যেমন ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা। রাজনীতিতেও কখনো কখনো মহামানবের উত্থান ঘটে। তার এক অঙ্গুলি হেলনে জনগণ উদ্বেলিত হয়। সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়। যেমন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শেখ হাসিনার ধমনিতে সেই রক্ত। যখনই বিপর্যয়, যখনই কালো মেঘে ঢাকা অন্ধকার তখনই শেখ হাসিনা আলোকবর্তিকা হয়ে সামনে এসেছেন। একাই সংকট কাটিয়েছেন। এটাই হয়তো তাঁর খেলার কৌশল। ’৭৫ দেখেছেন, ২০০১ দেখেছেন, ২০০৪-এর ২১ আগস্ট দেখেছেন। দেখেছেন এক-এগারো।  এ জন্য হয়তো একাই ঝুঁকি নিতে চাইছেন। বিশ্বাস শব্দটাই তাঁর চিন্তা থেকে উবে গেছে। একাই তিনি জয়ী করতে চান বাংলাদেশকে, জনগণকে। কি তিনি পারবেন? মেসি পারেননি কিন্তু ম্যারাডোনা পেরেছেন।  শেখ হাসিনা কি পারবেন?



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কূটনীতিতে ডাবল ধাক্কা কি কাকতলীয়?

প্রকাশ: ০১:৫৬ পিএম, ২৫ নভেম্বর, ২০২২


Thumbnail

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের বাংলাদেশ সফর করার কথা ছিলো। কিন্তু শেষ মুহূর্তের এই সফর বাতিল করা হয়েছে। সফর বাতিলের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যুদ্ধ নিয়ে তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি বাংলাদেশে আসতে পারছেন না। সফর বাতিল করলেও তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বহুল কাঙ্ক্ষিত জাপান সফর গতকাল স্থগিত হয়েছে। এই সফর স্থগিত হবার কোনো কারণ বলা হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন যে, তারিখ পুন:নির্ধারণ করা হবে। 

পরপর দু’টি সফর বাতিল কেবল কি কাকতালীয় নাকি এর পেছনে কোনো কূটনৈতিক ব্যর্থতা রয়েছে? বিশেষ করে এমন এক সময় এই দু’টি সফর বাতিল হলো যখন বাংলাদেশ কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অনেকটাই একাকীত্বে ভুগছে এবং অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলা করার জন্য সমর্থন এবং সহযোগিতা দরকার। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশে আসার কথা ছিলো একটি সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য। তার সফর সূচিও চূড়ান্ত হয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তার বৈঠকের কথা ছিলো। দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা করার কথা ছিলো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। এই বৈঠকে বাংলাদেশের অনেক ইতিবাচক অর্জন হতো যেটি বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারতো। কারণ রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান গম উৎপাদনকারী দেশ। তাছাড়া রাশিয়া থেকে জ্বালানি আনার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছিলো। এরকম প্রেক্ষাপটে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে  বাংলাদেশ হয়তো খাদ্য সহায়তা এবং জ্বালানি সহায়তার ক্ষেত্রে কিছু ছাড় পেতো। তাছাড়া এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদশের মুক্তিযুদ্ধের পরীক্ষিত বন্ধু রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব আরেকটু প্রগাঢ় হতো। যেটা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের জন্য ভারসাম্য রক্ষায় কাজে লাগতো। কিন্তু যুদ্ধের কারণে শেষ পর্যন্ত সফরটি বাতিল হয়েছে।

তবে, একাধিক কূটনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন এই সফর বাতিল সাপে বর হয়েছে। কারণ রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি এই সময় বাংলাদেশ সফর করতো তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বাড়াতো। কারণ রাশিয়ার ওপর এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোন আন্তর্জাতিক ফোরামেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি। এটা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের এক রকম অস্বস্তি রয়েছে। অনেকে মনে করেন বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো কিছুটা অসন্তুষ্ট বটে। তাই রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি বাংলাদেশ সফর করতো এবং উষ্ণ অভ্যর্থনা পেতো তবে দুই দেশের  সম্পর্কের প্রগাঢ়তা পশ্চিমা বিশ্বের উদ্দেশ্যে একটা ভুল বার্তা দিতো। সেদিক থেকে সফর না হওয়াটাই মন্দের ভালো হয়েছে। এখানে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। 

অন্যদিকে জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘদিনের পরীক্ষীত বন্ধু ও সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মিত্র। যতবারই প্রধানমন্ত্রী জাপানে গিয়েছেন, ততবারই কিছু না কিছু এনেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহায়তা সর্বজন বিদিত। এরকম একটি সময়ে জাপান সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আইএমএফের ঋণ পাওয়ার পর জাইকা থেকে ঋণ প্রাপ্তি এবং বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকল্পে জাপানের সহায়তা প্রাপ্তিটি বাংলাদেশের এই সংকটের জন্য ইতিবাচক হতো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর করার আগেই জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের ২০১৮ সালের নির্বাচন সম্পর্কে একটি মন্তব্য করেন। এই মন্তবের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এর সমালোচনা করেন। পররাষ্ট্র সচিব জাপানের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে তার সাথে কথা বলেন। এরকম একটি প্রেক্ষাপটের মধ্যে হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর বাতিল হওয়ার পেছনে অন্য কোন কারণ আছে কি না তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। তবে, কূতনৈতিকরা বলছেন যে, জাপান সফর বাতিল হয়নি বরং পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই একটি নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হবে। জাপান সফর স্থগিত করা হয়েছে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত কারণে। কারণ সেখানে করোনার প্রকোপ হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। এরকম পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান যাওয়াটা নিরাপদ নয় বিবেচনা করে সফর পেছানো হয়েছে। কাজেই এই দু’টি সফর বাতিল বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য কোন বিপর্যয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে বলেও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন