ইনসাইড আর্টিকেল

তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ

প্রকাশ: ১২:১৬ পিএম, ৩১ জুলাই, ২০২২


Thumbnail তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ

বর্তমানে দেশে গড়ে ৩৫ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বে বছরে আট লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে মারা যান। দৈনিক ১১৯ জন এবং লাখে ১৬ জন। কয়েকবছর আগেও এই সংখ্যা এতটা বাড়তি ছিল না। তবে গত দুইবছরে দেশে আত্মহত্যা প্রবণতা এবং আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। বয়সীমার ভিত্তিতে দেখা যায় আত্মহত্যায় মৃত্যু হওয়ার সংখ্যা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বেশি। গতবছরে দেশে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। 

ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভে এসে আত্মহত্যা করার উদাহরণও অনেক বেড়েছে। এর পিছনে মনোবিজ্ঞানীরা অনেক কারণ একসাথে দায়ি করেছেন। একাকীত্ব, বিষন্নতা, নিসঙ্গতা ইত্যাদি নানা কারণ থেকেই মানুষ এমন কাজ করতে পারে। তবে কোনো রকম ভার্চুয়াল সাইটে এই কাজগুলোর নেতিবাচক প্রভাব সকলের মধ্যেই কম বেশি পরে। অনেকেই তখন লাইভে বা ভার্জুয়াল জগৎে সকলে দেখিয়ে আত্মহত্যা করার পক্ষে যুক্তি খুঁজে পান। আবার কেউ কেউ  এই ধরণের কাজকে "বীরত্ব" ভেবে থাকেন।

বিবিসি এর এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে গত বছরে প্রায় ২০ হাজার মানুষ ফাঁসিতে ঝুলে কিংবা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। এদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যায় তুলনামূলক বেশি। জরিপ মতে, করোনাকালীন সময়ে আত্মহত্যার পরিমাণ বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। যা বিগত বছর গুলোর তুলনায় বেশি। আত্মহত্যা ঘটনার মামলা দায়ের হয়েছে ১৬৬ টি ২০২০-২০২১ সালের ৩১ সেপ্টেম্বর অবদি। কিন্তু এর বাইরেও অনেক ঘটনা রয়ে গেছে যা প্রকাশ্যে আসেনি। তবে বিগত কয়েকবছরে এই হার বা মান এতটাই বেড়েছে এবং শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা উদ্যোগের কারণে প্রাণহানির সংখ্যাও যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে তা খুবই দুশ্চিন্তাজনক। 

শহরাঞ্চলে আত্মহত্যার সংখ্যা বেশি। উন্নয়নশীলতা প্রক্রিয়া যত দ্রুত বৃদ্ধি ততই যেন জীবন মানের ক্ষয় হওয়াতে মানুষ মৃত্যুর পথ বেছে নিছে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ বিষটার উপর যেমন একটা যোগসূত্র জীবনযাত্রার মানের সাথে আছে, তেমনি এই মানের উপর নির্ভর করছে আত্মহত্যা সংখ্যা ঊর্ধ্ব বা নিম্ন গতি। 

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে "অ্যানথ্রপলজি" বিভাগে অধ্যায়নরত একজন শিক্ষার্থী,  ১৬ তলা বহুতল ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তাছাড়া করোনাকালীন সময়ের শুরু থেকে  বর্তমান দিন অবদি বহু শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করেছেন। কেন দৃষ্টিকটুভাবে বিগত বছর গুলোতে আত্মহত্যার সংখ্যা এবং এতে মৃত্যুহার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি তা নিয়ে বাংলা ইনসাইডার কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মতামত জানতে চেয়েছে। আত্মহত্যার এমন আকস্মিক বৃদ্ধি হার সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীরা জানান, "প্রযুক্তির উপর দৈনিক নির্ভরশীলতা মানুষের সামাজিক জীবনে যোগাযোগহীনতা বাড়িয়ে তুলছে, এতে করে মানুষের মধ্যে একাকীত্ব,  বিষন্নতা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি প্রতিহিংসা, প্রতিযোগিতা মূলক মনোভাব তৈরি করছে নানা মানসিক জটিলতার। এতে মানুষ একা অনুভব করে বা নানা চাপ অনুভব করে যারই পরিণাম আত্মহত্যা।" 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী মাইদুল ইসলামের কাছে এই প্রসঙ্গে মতামত জানতে চাইলে জানান, "বর্তমানে করোনা অতিমারির দুই বছর অতিক্রম করার পর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর পড়াশোনা কেন্দ্রিক নানা মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে পিছিয়ে পরার কারণে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মূল বিষন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া পারিবারিক বোঝাপড়ার অভাব অন্যতম বড় কারণ এই ক্ষেত্রে।" তিনি আরো জানান, অনেক সময় বন্ধুবান্ধব রা "কি ভাববে" অথবা যথাযথ বুঝবে না এই মনোভাবের জন্যও অনেকে অসুবিধার কথা প্রকাশ করতে চান না, এতে নিজেদের দূর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যাবে সেই অস্বস্তিতে। আগে যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠার সুযোগ ছিল বেশি। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির সংখ্যা আর পরিবারের সদস্যদের ব্যস্ততা যত বাড়ছে ততই টেকনোলজি দিয়ে অনেকে নিজেদের সাময়িকভাবে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও এতে শেষ অবদি বিষন্নতা বা জটিলতা বাড়ে, কমে না। 

আঁচল ফাউন্ডেশন ২০২১ সালের মার্চ মাসে এক প্রতিবেদনে জানায়, করোনাকালে এক বছরে সারা বাংলাদেশে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন আত্মহত্যা করেছেন৷ ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩টি জাতীয় পত্রিকা, ১৯টি স্থানীয় পত্রিকা, হাসপাতাল ও থানা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউল্যাবের সাংবাদিকতা বিভাগের আরো একজন শিক্ষার্থী থেকে মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি সম্পর্কে আলোচনা করলে তিনি বাংলা ইনসাইডারকে জানান, "বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের  যে ধরণের আর্থ-সামাজিক চাপের সম্মুখীন হতে হয় তা কঠিন। কর্মসংস্থানে যথাযথভাবে সুযোগ পাওয়া,  কিংবা কারিকুলাম এক্টিভিটির সিস্টেম অনেক সময় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াই। তাছাড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন একটা বড় কারণ। পারিবারিক, নিজস্ব এবং পারিপার্শ্বিক জীবনের প্রভাব তো আছেই যা মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যায়,  কিন্তু সেসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার মত সঙ্গ সব সময় গড়ে না উঠার কারণেই এই সমস্যা বাড়তে থাকে নিজেদের মধ্যে যার ভয়ংকর ফলাফল হয়ে দাঁড়ায় আত্মহত্যা। "

ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি অনেক সংস্থা মানসিক স্বাস্থ্য কল্যাণ সম্পর্কিত বিভিন্ন সচেতনা বৃদ্ধি উদ্দেশ্যে বেশ কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নানা জরিপ, পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনা মূলক এইসব কর্মসূচির কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। 

মানসিক স্বাস্থ্যও যে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতই গুরুত্বপূর্ণ তা অনেকেই বুঝতে পারেন না৷ পৃথিবীতে  নগরাঞ্চলেই আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটে। বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ছে৷ প্রযুক্তি মানুষকে যেমন সচেতন করে তেমনি আত্মহত্যাপ্রবণ করে৷ তাই প্রযুক্তির ব্যবহার, যথাযথ যোগাযোগ, বোঝাপড়া এবং সহমর্মিতা হতে পারে কোনো তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে না যাওয়ার প্রতিষেধক।  

তরুণ   আত্মহত্যা  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

‘ঊনো বর্ষার দুনো শীত', এলো কি?

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail "ঊনো বর্ষার দুনো শীত', এলো কি

অফিস থেকে বের হয়ে বাসার উদ্দ্যেশ্যে হাঁটছিলাম। কিছুদূর এগোতেই চোখ আটকে গেল একটা ঠেলাগড়ির দিকে। ঠেলাগড়িতে একের পর এক গরম ভাপা এবং চিতই পিঠা নামিয়ে রাখছে একটা ছেলে। গরম ভাপা পিঠা দেখেই কিনা, সামনে এগিয়ে গেলাম, দিতেও বললাম একটা পিঠা। না চাইতেই সদ্য চুলা থেকে নামিয়ে দেয়া ভাপা পিঠা প্লেটে করে হাতে দিয়ে দিল ছেলেটি। গুড় আর নারকেল কোড়া দেয়া ভাপা পিঠেটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ, তারপর এক কোণা থেকে ভেঙ্গে মুখে চালান করে দিলাম। ঠিক এইবার, হঠাৎ মনে হল শীত চলে আসছে, আর এই ছোট পিঠার দোকানটি এই ইট পাথরের রাজধানীকে  জানান দিচ্ছে শীতের আমেজ শুরু হল বলে।

শীত এমন একটি ঋতু যা হুট করেই আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে আসে না। বরং সে তার আগমনী বার্তা দিতে থাকে প্রকৃতিতে।  শহরে এবং গ্রামে, দুই স্থানে শীতের আগমনী সংকেত কিন্তু ভিন্ন হয়। তবে দুই স্থানের আমেজ এবং প্রকৃতির রূপ বদল কিন্তু  সম্পূর্ণ আলাদা। এবং দুই জায়গার সৌন্দর্য ধরা দেয় দুই রকমভাবে।

যেহেতু আমাদের গ্রাম বাংলা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যে সজ্জিত, সেহেতু প্রথমেই গ্রাম বাংলার শীতের আমেজ দিয়েই শুরু করি আজকের লেখা। শীতের আগমনী সংকেত সব থেকে বেশি পরে এই গ্রাম বাংলার প্রকৃতিতে। সকালের হালকা বাতাসে ঠান্ডা হাল্কা কুয়াশার চাঁদর, ঘাসের উপর মুক্ত দানার শিশির কনা জানান দেয় শীত আসছে।  দিন রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য অনেকটাই বেশি টের পাওয়া যায় গ্রামের প্রকৃতিতে। সকালে হিম হিম ঠান্ডা আবার রোদ উঠলেই হাল্কা গরম, আবার সন্ধ্যে নামলেই আরেকটু ঠান্ডা অনুভত হয়। এসময় হেমন্তের ধান কাটারও একটা পর্ব শুরু হয়ে যায়। আর ধান কাটার পর পিঠা পুলি দিয়ে হেমন্তের নবান্ন উৎসব শীতের আরেকটা পর্ব যা আরেকবার নতুন করে জানান দেয় শীতের আগমনী ধ্বনি। 

শহরে শীত আসে ধীরে। শহরের বেশ কিছু পরিবর্তন দেখেই মূলত বুঝে নিতে হয় শীত আসছে। ভোরে উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের মাথা ঝাপসা দেখলে সহজে বোঝার উপায় থাকে না শীত নাকি ধোয়া। কিন্তু সকালের ঠান্ডা হাল্কা বাতাসে বুঝে নিতে হয় শীত আসছে। এছাড়া শহরের বাজারগুলোতে উঠতে থাকে শীতের নানান সবজি। দাম বেশি হলেও এই সবজি গুলোই শহরবাসীকে ইঙ্গিত দিয়ে যায় শীত শুরু হল বলে। এছাড়া শীতের আমেজ পরে যায় রাস্তার ধারের খাবারের দোকানগুলোতেও।  এসময় বসে যায় থরে থরে পিঠার দোকান। শহরের ইট পাথরের দেয়াল ঘেরা  প্রকৃতিতে শীত বোঝা যায় খুব অল্প বিস্তর কিন্তু শহরের এই অলিতে গলিতে তুমুল পরিবর্তনেরও রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। 

গ্রাম কিংবা শহর, শীত আসার আগের মূল আকর্ষণই হয় বিভিন্ন স্বাদের পিঠা। শীত আসার আগে থেকেই পিঠা তৈরির একটা ব্যাপার চারপাশেই খেয়াল করা যায়।  গ্রামের দিকে বাড়িতে বাড়িতে সকালেই দেখা যায় গরম উনুনে পিঠা চেপে বানিয়ে ফেলছে ভাপা, চিতই, তেলপিঠা,পাটিশাপ্টা আরও কত কি। আর শহরের দিকে পিঠা পর্ব শুরু হয় বিকেল থেকে। ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত মানুষ যখন অফিস শেষে ঘরমুখী হয়, রাস্তার পাশের ছোট পিঠের দোকানেই তারা ফিরে যায় অতীত শৈশবে। গরম ভাপা, চিতই মুখে পুরে শীত আসার অনুভূতি নেয় তারা।

শীত আসার আগে যেমন আগমনী বার্তা দেয় তেমনি সাথে দেয় পরিবর্তনশীল আবহাওয়া। আর এই পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার ঠান্ডা গরম পরিবেশে  খাপ-খাওয়াতে পারেন না অনেকে। যে কারণে কেউ কেউ সর্দি-জ্বর, কাশিসহ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হন। সব বয়সির মধ্যে এই সমস্যা দেখা গেলেও শিশু আর বয়স্করা একটু বেশি নাজুক থাকায় তাদের উপর প্রভাব পরে অনেক বেশি। তাই তাদেরকে সতর্কও থাকতে হবে অনেকটা।

শহর কিংবা গ্রাম,শরতের পরেই শীতের আমেজ আসতে শুরু করে দেশে। দেশের উত্তরাঞ্চলে সব থেকে বেশি শীতের আমেজ পরিলক্ষিত হয়। শীত আসার আগের এই সময়টুকু শুধু উপভোগ করলেই চলবে না বরং শীত আসার আগেই নিয়ে নিতে হবে শীতের প্রস্তুতি।  পরিবর্তনের আবহাওয়ায় থাকতে হবে সতর্ক। কথায় আছে যে বছর বর্ষায় বৃষ্টি কম হয় সে বছর শীত একদম জেকে বসে। এবার আমাদের দেশে বৃষ্টিও কম হয়েছে, তাই ভাবাই যেতে পারে এবার শীতটাও হয়তো জেকে বসবে। তাই আগে থেকেই নিতে হবে প্রস্তুতি। আপাতত ঊনো বর্ষার দুনো শীতকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই বরং আমরা দেখতে থাকি প্রকৃতির পরিবর্তন আর ধীরে ধীরে স্বাগত জানাই আগমনী শীতকে।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

নদী, মৃত্যু এবং আমরা সাধারণ

প্রকাশ: ০৯:১৭ এএম, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail

নৌকাডুবি, ট্রলার ডুবি কিংবা লঞ্চ ডুবি দেশের এখন নিত্যদিনের ঘটনা। কয়েক দিন আগে পঞ্চগড়ের বোদায় নৌকাডুবে নিহত হয়েছে অনেক। এ ঘটনায় এখনো লাশের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই নৌকাডুবি কিংবা ট্রলার ডুবির সংখ্যা এত বাড়ছে কেন?

শুধুমাত্র সরকারের ওপর দোষ চাপালেই হয়না বরং দেশে ঘটা অনেক দুর্ঘটনা এবং প্রাণহাণীর জন্য  দায়ী  থাকি আমরা নিজেরাই। নিজেদের সচেতনতার অভাব এবং দায়িত্বহীনতা আমাদের দেশের ঘটা অনেক অঘটনের জন্যে দায়ী। সদ্য পঞ্চগড়ে নৌকাডুবিও তারই ইঙ্গিত দেয়।

দেশে নৌ দুর্ঘটনা কমছেই না। দেশে থাকা অগণিত হাওর বাওরে প্রতিনিয়ত চলছে ট্রলার, নৌকা, লঞ্চ, জাহাজ, স্প্রিডবোর্ড। শুধুমাত্র বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটলেই পত্রিকায় তা ফলাও করে ছাপানো হয় কিন্তু ছোটখাট দুর্ঘটনাগুলো চাপা পরেই থাকে। কিন্তু গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে যে হারে নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে তা রীতিমত চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এইসব দুর্ঘটনা ঘটছে যত টানা নদীর স্রোত কিংবা বৈরি আবহাওয়ার জন্য, ততটাই আমাদের নিজেদের অসচেতনতা আর অব্যবস্থাপনার জন্যেই ঘটছে।

পঞ্চগড়ের বোদায় ঘটা দুর্ঘটনার দিকে তাকালে শুরুতেই বলা যায় অসচেতনতাই এই নৌকাডুবির কারণ। নৌকায় যাত্রী ওঠানোর আগ মুহুর্তের একটা ছোট ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই। এই ভিডিওটিতে দেখলেই বোঝা যায় এই ছোট নৌকাটি কতজন লোক উঠেছিল। আপাত দৃষ্টিতে দেখা যায় নিজেদের বিপদ নিজেরাই যেন ডেকে নিয়ে এসেছিল সবাই। তিল ঠাই দেয়ার জায়গা ছিল না নৌকাটিতে।ঘাট থেকে শতাধিক যাত্রী নিয়ে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি বড়শশী ইউনিয়নের বোদেশ্বরী মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। নদীর মাঝে গিয়ে স্রােতে দুলতে শুরু করে নৌকা। কিছুক্ষণের মধ্যেই উল্টে যায় নৌকাটি। যেখানে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে করতোয়া নদীর এই জায়গাটি এমনিতে খুব খরস্রােতা নয়; গভীরতাও খুব বেশি নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক টানা বর্ষণের পর উজানের ঢলে নদীতে পানি বেড়েছে অনেকটা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, নৌকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ যাচ্ছিল। দুর্ঘটনায় পড়া নৌকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী ওঠায় এবং মাঝনদীতে নৌকাডুবির কারণে মৃত্যু এত বেশি হয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

এত গেল পঞ্চগড়ের বোদার ঘটনা। বাংলাদেশে ভূরি ভূরি লঞ্চ বা স্টিমার দুর্ঘটনা ঘটে অসম প্রতিযোগিতা করে লঞ্চ চালানোর কারণে। আর এসকল লঞ্চে কখনো থাকে অভিজ্ঞ আবার কখনো অনভিজ্ঞ চালকগণ। যাদের কাছে লঞ্চ, নৌকা কিংবা স্টিমারে থাকা মানুষের জানমালের চেয়ে প্রতিযোগিতাটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া যেখানে নদী বন্দরের এইসব চালক থেকে শুরু করে মালিক পক্ষের আবহাওয়া বার্তা পড়া বা শোনা বাধ্যতামূলক, তার তোয়াক্কা তো তারা করেই না। আর এসবের খেসারত দিতে হয় অনেকগুলো মৃত্যু দিয়ে, অনেক গুলো পরিবারের দুঃস্বপ্ন দিয়ে।

এখন তো নৌকাডুবি কিংবা ট্রলার লঞ্চ ডুবি খুব স্বাভাবিক ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে । মাসে  একটা দুটো  এমন দুর্ঘটনা ঘটে, মাঠ গরম হয়, তদন্ত কমিটি গঠন হয়, লাশ নিয়ে ছোটাছুটি শুরু হয়। কেউবা আবার ক্ষতিপূরনের টাকা নিয়ে দৌড়ায়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই পরিস্থিতি ঠান্ডা 
 হয় এবং একই ঘটনার পূনরাবৃত্তি। কিন্তু এইসব দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়া, সচেতনতা তৈরি হওয়ার কোন লক্ষন কোথাও দেখা যায় না। ক্ষতিপূরণের টাকা সরকার থেকে দেয়া হলেও সেগুলো কার পকেটে যায় তারও আর কোন খবর থাকে না।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, এদেশের পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম নদীপথ। কিন্তু আমাদের অসেচতনতার অভাবে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে অনেক মানুষ। নদীপথ নিরাপদ করতে যেমন সরকারি ভাবেও উদ্যোগ নিতে হবে, তেমনি আমাদেরকেও সচেতন হতে হবে। আমরা সচেতন হলেই বাঁচবে দেশ, কমবে দুর্ঘটনা, বাঁচবে প্রাণ।

নৌকাডুবি   অসচেতনতা   প্রাণহানী  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

পূজোয় বাঙালি রসনা

প্রকাশ: ০৯:২৪ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail পূজোয় বাঙালি রসনা

বাঙালির রসনা বিলাসের শেষ নেই। বাঙালির যেমন আছে বার মাসে তের পার্বণ তেমনি আছে এর সাথে রসনার যোগসূত্র। বাঙালির যেন উৎসবই জমে না টেবিল ভর্তি বাঙালি খাবার ছাড়া। মহালয়া দিয়ে পূজার বাদ্যি বেজে গেল, এখন শুধু তাই পূজার দিনে বাঙালির রসনা বিলাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে প্রত্যেকটি বাড়িতে। পেট পূজা ছাড়া কি আর পূজোর আনন্দ জমে?

পূজার মূল আকর্ষণ হল পূজায় তৈরি প্রত্যেক বাড়ির মিষ্টি খাবার গুলো। কি নেই এতে? নাড়ু, সন্দেশ, বাহারি লাড্ডু, খঁই, বিভিন্ন রকমের মোয়া, পাটালি, পায়েস। মিষ্টি ছাড়া যেন জমেই না দুর্গাপূজা। তবে দুর্গাপূজায় যে জিনিসটি সব বাসাতেই তৈরি হয় তা হলো নারিকেলের নাড়ু। গুড়ের কিংবা চিনির, নাড়ু ছাড়া যেন দুর্গাপূজা কল্পনাই করা যায় না। ষষ্ঠী থেকে দশমী পূজার প্রসাদ তো থাকেই, সাথে থাকে আরও নানান ভিন্ন স্বাদের খাবার। আমিষ থেকে নিরামিষ সবই খাওয়া চলে রীতি নিয়ম মেনে।


পূজায় নিরামিষ আমিষের একটা ঝক্কি অবশ্য থাকেই। যারা পূজার আয়োজক থাকেন, তারা নিয়ম মেনে নিরামিষ খান। ষষ্ঠির সকালে তাই বাসায় চলে ফুলকো লুচি, সবজি , বুটের ডাল কিংবা  মিষ্টি। পূজার আয়োজকে যারা থাকেন তারা পুরো সময় জুড়ে নিরামিষ খান। দশমীর দিন কিংবা অষ্টমঙ্গলার দিনে গিয়ে তারা নিয়ম বা শাস্ত্র মেনে আমিষ খেতে পারেন। 

মূলত পূজায় যারা পূজার আয়োজকে থাকেন না তারা আমিষ খেতে পারেন। দেখা যায় দুপুরে হয়তো পোলাওয়ের সাথে কচি পাঁঠার মাংস, কিংবা গাঢ় ঝোলে ডুবে থাকা পনিরের টুকরো দিয়ে চলে দুপুরের ভোজ। এছাড়া পূজোয় আবার তৈরি হয় নানা পদের চমকপ্রদ খাবারও যেগুলো কিনা শুধুমাত্র পূজারই আকর্ষণ। এই চমকপ্রদ খাবারের তালিকায় প্রথম নাম যেটি আসে, সেটি হল ভূনা খিচুড়ী। খিচুড়ীর সাথে কয়েক পদের ভাজা খাবার না থাকলেও যেন  জমে না। তাই ভূনা খিচুড়ীর সাথে পাতে পরে বেগুনি কিংবা পিয়াজু, কিংবা কুরকুরে আলুর ভাজা। এছাড়া আরেকটি আকর্ষণ হলো আলুর দম। গোটা গোটা আলুর সাথে যখন ফুলকো লুচিগুলো  ছিড়ে মুখে পুড়ে দেয়া যায়, স্বাদের একটা গোলা যেন মুখে একটা নাড়া দিয়ে যায়।

পূজার দিনের আরও  নানান পদে থাকে আমড়ার চাটনি, লাবড়া,  সরশে পটোল, পোস্ত বেগুনি, চিতল মাছের কোপ্তা কারি, ভাঁপে ইলিশ, নারকেল দিয়ে ছোলার ডাল, সরষে ইলিশ।এই খাবারগুলো পরিবেশন করাও হয় আমিষ, নিরামিষ এসকল ভেদে । দুর্গাপূজার খাবার দাবারের মূল পর্ব দশমীর দিন শুরু হয় এক  কথায়। মাকে বিদায় দেয়ার কষ্ট যেন বাঙালি ভুলে যেতে চায় কব্জি ডুবিয়ে খাবারের মাধ্যমে। কারণ ষষ্ঠি থেকে নবমী এই দিন গুলোতে কেউ নিরামিষ, কেউ আমিষ খায়। কিন্তু দশমীর দিনটি যেন হয়ে ওঠে আমিষের। মাছ মাংসের সব পদই খাওয়া যায় এই দিনে।

দশমীর দিন কেউ শুরু করেন ঘরে পাতানো সাদা দইয়ে চিড়া ভিজে খেয়ে। সাদা টক দইয়ের সাথে চিড়া আর চিনি যখন মাখানো হয়, মিষ্টি ঘ্রাণ যেন নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়। এরপর চলে কব্জি ডুবিয়ে দই চিড়া খাওয়ার পব। দুপুরের দিকে খাওয়া হয় কচি পাঠাঁর মাংস। কাসার থালে যখন মাংসের লাল ঝোল মেখে ধোয়া ছড়ায়, পেটের ক্ষুধা যেন হঠাৎই বেড়ে যায় দশ গুণ। এছাড়া আবার রান্না হয় ঘণ পেয়াজ কুচির সাথে রুইয়ের ঝোল। আবার অনেক সময় তৈরি হয় মাছের মুড়ো দিয়ে মূড়িঘন্ট। সোনা মুগ ডাল যখন ভেজে মাছের মাথার কষানো ঝোলে গিয়ে পরে দেখলেই যেন অর্ধেক ভোজন তখনি হয়ে যায়। আর পূজোর বিকেলটা তো চলে যায় পূজো মন্ডবের নানান খাবার  দিয়েই।