ইনসাইড আর্টিকেল

পূজোয় বাঙালি রসনা

প্রকাশ: ০৯:২৪ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২


Thumbnail পূজোয় বাঙালি রসনা

বাঙালির রসনা বিলাসের শেষ নেই। বাঙালির যেমন আছে বার মাসে তের পার্বণ তেমনি আছে এর সাথে রসনার যোগসূত্র। বাঙালির যেন উৎসবই জমে না টেবিল ভর্তি বাঙালি খাবার ছাড়া। মহালয়া দিয়ে পূজার বাদ্যি বেজে গেল, এখন শুধু তাই পূজার দিনে বাঙালির রসনা বিলাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে প্রত্যেকটি বাড়িতে। পেট পূজা ছাড়া কি আর পূজোর আনন্দ জমে?

পূজার মূল আকর্ষণ হল পূজায় তৈরি প্রত্যেক বাড়ির মিষ্টি খাবার গুলো। কি নেই এতে? নাড়ু, সন্দেশ, বাহারি লাড্ডু, খঁই, বিভিন্ন রকমের মোয়া, পাটালি, পায়েস। মিষ্টি ছাড়া যেন জমেই না দুর্গাপূজা। তবে দুর্গাপূজায় যে জিনিসটি সব বাসাতেই তৈরি হয় তা হলো নারিকেলের নাড়ু। গুড়ের কিংবা চিনির, নাড়ু ছাড়া যেন দুর্গাপূজা কল্পনাই করা যায় না। ষষ্ঠী থেকে দশমী পূজার প্রসাদ তো থাকেই, সাথে থাকে আরও নানান ভিন্ন স্বাদের খাবার। আমিষ থেকে নিরামিষ সবই খাওয়া চলে রীতি নিয়ম মেনে।


পূজায় নিরামিষ আমিষের একটা ঝক্কি অবশ্য থাকেই। যারা পূজার আয়োজক থাকেন, তারা নিয়ম মেনে নিরামিষ খান। ষষ্ঠির সকালে তাই বাসায় চলে ফুলকো লুচি, সবজি , বুটের ডাল কিংবা  মিষ্টি। পূজার আয়োজকে যারা থাকেন তারা পুরো সময় জুড়ে নিরামিষ খান। দশমীর দিন কিংবা অষ্টমঙ্গলার দিনে গিয়ে তারা নিয়ম বা শাস্ত্র মেনে আমিষ খেতে পারেন। 

মূলত পূজায় যারা পূজার আয়োজকে থাকেন না তারা আমিষ খেতে পারেন। দেখা যায় দুপুরে হয়তো পোলাওয়ের সাথে কচি পাঁঠার মাংস, কিংবা গাঢ় ঝোলে ডুবে থাকা পনিরের টুকরো দিয়ে চলে দুপুরের ভোজ। এছাড়া পূজোয় আবার তৈরি হয় নানা পদের চমকপ্রদ খাবারও যেগুলো কিনা শুধুমাত্র পূজারই আকর্ষণ। এই চমকপ্রদ খাবারের তালিকায় প্রথম নাম যেটি আসে, সেটি হল ভূনা খিচুড়ী। খিচুড়ীর সাথে কয়েক পদের ভাজা খাবার না থাকলেও যেন  জমে না। তাই ভূনা খিচুড়ীর সাথে পাতে পরে বেগুনি কিংবা পিয়াজু, কিংবা কুরকুরে আলুর ভাজা। এছাড়া আরেকটি আকর্ষণ হলো আলুর দম। গোটা গোটা আলুর সাথে যখন ফুলকো লুচিগুলো  ছিড়ে মুখে পুড়ে দেয়া যায়, স্বাদের একটা গোলা যেন মুখে একটা নাড়া দিয়ে যায়।

পূজার দিনের আরও  নানান পদে থাকে আমড়ার চাটনি, লাবড়া,  সরশে পটোল, পোস্ত বেগুনি, চিতল মাছের কোপ্তা কারি, ভাঁপে ইলিশ, নারকেল দিয়ে ছোলার ডাল, সরষে ইলিশ।এই খাবারগুলো পরিবেশন করাও হয় আমিষ, নিরামিষ এসকল ভেদে । দুর্গাপূজার খাবার দাবারের মূল পর্ব দশমীর দিন শুরু হয় এক  কথায়। মাকে বিদায় দেয়ার কষ্ট যেন বাঙালি ভুলে যেতে চায় কব্জি ডুবিয়ে খাবারের মাধ্যমে। কারণ ষষ্ঠি থেকে নবমী এই দিন গুলোতে কেউ নিরামিষ, কেউ আমিষ খায়। কিন্তু দশমীর দিনটি যেন হয়ে ওঠে আমিষের। মাছ মাংসের সব পদই খাওয়া যায় এই দিনে।

দশমীর দিন কেউ শুরু করেন ঘরে পাতানো সাদা দইয়ে চিড়া ভিজে খেয়ে। সাদা টক দইয়ের সাথে চিড়া আর চিনি যখন মাখানো হয়, মিষ্টি ঘ্রাণ যেন নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়। এরপর চলে কব্জি ডুবিয়ে দই চিড়া খাওয়ার পব। দুপুরের দিকে খাওয়া হয় কচি পাঠাঁর মাংস। কাসার থালে যখন মাংসের লাল ঝোল মেখে ধোয়া ছড়ায়, পেটের ক্ষুধা যেন হঠাৎই বেড়ে যায় দশ গুণ। এছাড়া আবার রান্না হয় ঘণ পেয়াজ কুচির সাথে রুইয়ের ঝোল। আবার অনেক সময় তৈরি হয় মাছের মুড়ো দিয়ে মূড়িঘন্ট। সোনা মুগ ডাল যখন ভেজে মাছের মাথার কষানো ঝোলে গিয়ে পরে দেখলেই যেন অর্ধেক ভোজন তখনি হয়ে যায়। আর পূজোর বিকেলটা তো চলে যায় পূজো মন্ডবের নানান খাবার  দিয়েই।


দুর্গাপূজা বাংলার ঐতিহ্য। ঐতিহ্যের সাথে বাংলার রসনা বিলাসের যে যোগসূত্র তা দুর্গাপূজার আয়োজনে দেখা মেলে। প্রতিদিনের শাস্ত্রীয় রীতি মেনে পূজার বিভিন্ন স্বাদের খাবার পূজার আনন্দ বাড়িয়ে দেয় আরও অনেক গুণ।

পূজা   খাবার   ঐতিহ্য  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে জাতির পিতার মূল্যায়ন

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ০৫ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতির আদর্শিক গুরু। বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন লেখায়, বক্তৃতায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ব্যাপক প্রশংসা করেছেন। যদিও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দীকে খুব একটা স্মরণ করা হয় না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সম্পর্কে জাতির পিতার মূল্যায়ন পাওয়া যায় তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। আজ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পাঠকদের জন্য অসমাপ্ত আত্মজীবনীর একটি চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

শহীদ সাহেব ছিলেন উদার, নীচতা ছিল না, দল মত দেখতেন না, কোটারি করতে জানতেন না, গ্রুপ করারও চেষ্টা করতেন না। উপযুক্ত হলেই তাকে পছন্দ করতেন এবং বিশ্বাস করতেন। কারণ, তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল অসীম। তাঁর সাধুতা, নীতি, কর্মশক্তি ও দক্ষতা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে চাইতেন। এজন্য তাঁকে বার বার অপমানিত ও পরাজয়বরণ করতে হয়েছে। উদারতা দরকার, কিন্তু নীচ অন্তঃকরণের ব্যক্তিদের সাথে উদারতা দেখালে ভবিষ্যতে ভালর থেকে মন্দই বেশি হয়, দেশের ও জনগণের ক্ষতি হয়।

আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল 'আমরা মুসলমান, আর একটা হল, আমরা বাঙালি।' পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, 'পরশ্রীকাতরতা। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে ‘পরশ্রীকাতর' বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা, সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ায় খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।

অনেক সময় দেখা গেছে, একজন অশিক্ষিত লোক লম্বা কাপড়, সুন্দর চেহারা, ভাল দাড়ি, সামান্য আরবি ফার্সি বলতে পারে, বাংলাদেশে এসে পীর হয়ে গেছে। বাঙালি হাজার হাজার টাকা তাকে দিয়েছে একটু দোয়া পাওয়ার লোভে। ভাল করে খবর নিয়ে দেখলে দেখা যাবে এ লোকটা কলকাতার কোন ফলের দোকানের কর্মচারী অথবা ডাকাতি বা খুনের মামলার আসামি। অন্ধ কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসও বাঙালির দুঃখের আর একটা কারণ।

বাঙালিরা শহীদ সাহেবকে প্রথম চিনতে পারে নাই। যখন চিনতে পারল, তখন আর সময় ছিল না। নির্বাচনের সব খরচ, প্রচার, সংগঠন তাঁকেই এককভাবে করতে হয়। টাকা বোধহয় সামান্য কিছু কেন্দ্রীয় লীগ দিয়েছিল, বাকি শহীদ সাহেবকেই জোগাড় করতে হয়েছিল। শত শত সাইকেল তাকেই কিনতে হয়েছিল। আমার জানা মতে পাকিস্তান হয়ে যাবার পরেও তাঁকে কলকাতায় বসে দেনা শোধ করতে হয়। আমি পূর্বেই বলেছি, শহীদ সাহেব সরল লোক ছিলেন। তিনি ধোঁকায় পড়ে গেলেন। পার্লামেন্টারি বোর্ডে তাঁর দল সংখ্যাগুরু থাকা সত্ত্বেও নিজের লোককে তিনি নমিনেশন দিতে পারলেন না। নাজিমুদ্দীন সাহেবের দল পরাজিত হওয়ার পরে তারা অন্য পন্থা অবলম্বন করলেন। ঘোষণা করলেন, তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না অর্থাৎ শহীদ সাহেবই দলের নেতা হবেন। তিনি শহীদ সাহেবকে অনুরোধ করলেন যারা পূর্ব থেকে মুসলিম লীগে আছে। তাদের নমিনেশন দেওয়া হোক, কারণ এরা সকলেই শহীদ সাহেবকে সমর্থন করবেন। খাজা সাহেব যখন নির্বাচন করবেন না তখন আর ভয় কি? শহীদ সাহেব এই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে পুরানা এমএলএ প্রায় সকলকেই নমিনেশন দিয়ে দেন। বোধহয় তখন বাংলাদেশে একশত উনিশটা সিট মুসলমানদের ছিল। এই চাতুর্যে প্রায় পঞ্চাশজন খাজা সাহেবের দলের লোক নমিনেশন পেয়ে গেল। আবার কেন্দ্রীয় লীগে খাজা সাহেবের সমর্থক বেশি ছিলেন। লিয়াকত আলী খান, খালিকুজ্জামান, হোসেন ইমাম, চুন্দ্রিগড় সাহেব সকলেই শহীদ সাহেবকে মনে মনে ভয় করতেন। কারণ সকল বিষয়েই শহীদ সাহেব এঁদের থেকে উপযুক্ত ছিলেন। কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি বোর্ডও প্রায় ত্রিশজনের নমিনেশন পাল্টিয়ে দিলেন। এদের মধ্যে দুই একজন শহীদ সাহেবেরও সমর্থক ছিলেন, একথা অস্বীকার করা যায় না।



মন্তব্য করুন