ইনসাইড থট

মহামান্যের সমাবর্তন ভাষণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের দিনগুলি


Thumbnail

ইচ্ছে ছিল এবারকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের দিনে বিভাগ/হল /বিশ্বিদ্যালয়ে যাবো। আমাদের কপালে সমাবর্তন জোটে নি- কারণ স্বৈরাচারী এরশাদ ছিলেন আচার্য। উনার কাছ থেকে আমরা যেমন সনদ নিতে চাইনি, তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিতে চায় নি। সেই সাহসী হিমালয়ের মতো সুউচ্চ নৈতিকতার অধিকারী শিক্ষকের অভাব আজ সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের সমাবর্তন ভাষণে সেটাই ফুটে উঠেছে। 

এবার সতর্ক বার্তা ছিল অজানা প্রান্তের অজানা কণ্ঠ থেকে - আগামী এক মাস যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাই! সুতরাং, ঘরে বসে স্মৃতি রোমন্থন করছিলামবন্ধুদের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপচারিতায়।  ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৯১ সালে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হওয়া পর্যন্ত আমার সময়গুলো কেটেছে কবি জসীমউদ্দীন হলে। চারতলায় আমার রুম ছিল। একান্ত আমার একটি সিট যা আমার মেধার স্বীকৃতি। রুমমেট হিসেবে যাদের পেয়েছিলাম তাদের মধ্য থেকে করোনায় হারিয়েছি স্কুলজীবনের বন্ধু আহসানুল ইসলাম ডিককে। ডিক ফিন্যান্সের ছাত্র ছিল। খুবই পরোপকারী বন্ধু। নিজের ক্ষতি করে বন্ধুর উপকার করা ছিলো ডিকের স্বভাব। স্বৈরাচারী এরশাদের নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ তাকে কিছুদিনের জন্য হল ছাড়তে বাধ্য করেছিল। বিষয় হলে সিট দখল নিয়ে নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের অন্যায়কে প্রতিবাদ করেছিল ডিক। নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের নেতারা তাদের মতো করে হল চালাতে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রলীগ/সমাজকে তখন প্ৰতিপক্ষ হিসেবে নিয়ে নিপীড়ন করতো। মারধোর ছাড়া ফ্লোরে থুথু ফেলে সেটা চেটে খেতে বাধ্য করতো! সেই বীভৎস নিপীড়ণের স্বীকার ছাত্রনেতারা দেশের উচ্চ পদে আসীন হয়েছেন।

আমার আরেক রুম মেট ছিলেন স ম আলাউদ্দিন। খুবই হাসিখুশি একজন মানুষ। ইতিহাসের এই ছাত্র সচিবালয় ঘেরাও করতে চলে যেতেন। এরশাদবিরোধী এমন কোনো আন্দোলন নেই যে আন্দোলনে আলাউদ্দিন ভাই থাকেননি। গণতন্ত্রের আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান এই সেদিন সমাবর্তন উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বীকার করলেন। ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মহামান্য বেশ কিছু কথা বলেছেন যা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ১৯৯০ সালের ১১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এরশাদের আদেশ অমান্য করে যে আন্দোলন শুরু করেছিল সেকথা আমি আগের লেখায় বলেছি।

মুক্তির সংগ্রামে, স্বাধীনতার সংগ্রামে শহীদ হয়েছেন শিক্ষকরা।  সেই জাতির বিবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এরশাদের জরুরি আইন অমান্য করে ৬ডিসেম্বর রাজপথে নামে এবং একযোগে সকলে পদত্যাগ করেন। গণতন্ত্রের প্রতি এই শ্রদ্ধা দেখিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল- আজ মহামান্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে আক্ষেপ করে বলছেন শিক্ষকদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার কথা।

মহামান্য বিনয়ের সঙ্গে আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে পারি কি? আপনি কি ভেবেছেন স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে কেন এমন হলো? গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাত্র -ছাত্রী ২০০৭ সালে কি ঝুঁকি নিয়েছিলেন, কিভাবে তারা জেল খেটেছেন, কিভাবে তাদেরকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেগুলোকি আমরা মনে রেখেছি? পাঠকদের কাছে বিনয়ের সঙ্গে মন জানতে চায়,আমাদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্রের সুফল ভোগ কারা করছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির কোনায় ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ডাক্তার মিলনকে হত্যা করা হয়েছিল খুবই ঠান্ডা মাথায়।সবচে মেধাবী সেই ডাক্তাররা কি কখনো প্রথম গ্রেড পায়? সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্র -ছাত্রী, শিক্ষক -কর্মচারী -কর্মকর্তা গুলির তান্ডবে ছিল দিশেহারা। প্রাণভয়ে সকলে ছুটেছিল।কোথা থেকে গুলি আসছিলো কেউ বুঝতে পারছিলাম না।সেদিন যারা রুখে দিয়েছিলো তারা কিভাবে অবহেলিত তা কি আমাদের অজানা !

আমাদের সকল সুযোগ সুবিধা পান যারা তাদের সম্পর্কে আজনা-ই বললাম, কিন্তু শিক্ষকদের জীবন কিভাবে কাটছে সেটাও যেন আমরা দেখি। সমাজ দেখেও না দেখার ভান করে-ট্যাক্স, ভ্যাট সবই কিন্তু শিক্ষকরা দেন। আর কারা ট্যাক্স ফাঁকি দেয় , বিদেশে অর্থ পাচার করে সেটাও আজ অজানা নয়। কিন্তু শিক্ষকদের কষ্টকে বিবেচনায় না রেখে রসালো ভাবে বলা হয় "ভর্তি পরীক্ষার টাকা ভাগ বাটোয়ারা " করে খায় শিক্ষকরা।

সবচে মেধাবী যে ছাত্রটি শিক্ষক হয়েছেন তাকে ধুলো মাখিয়ে কাদের সন্তানেরা রাজবেশে চলে যান সমাজ কি তা জানেনা?  অপেক্ষা করতে করতে যখন আর কোনো উপায় বা সম্ভাবনা দেখেন না,তখন তারা যাচ্ছেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা সান্ধ্যকালীন ক্লাসে। এভাবে শিক্ষকদেরকে তাদের আদর্শর পথ থেকে নিয়ে গেলো যে বাজার অর্থনীতি তার দায় কি কেবল শিক্ষকদের? সেটা অনুসন্ধান করা প্ৰয়োজন।

১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ডাক্তার মিলন শহীদি মৃত্যুবরণ করেন। এই বিষয়ে এক লেখক লিখেছেন "তার মৃত্যুতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন দাবানলে রূপ নেয়।ডাক্তাররা শুরু করেন অবিরাম কর্মবিরতি। গণপদত্যাগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। জরুরি অবস্থা জারি করে স্বৈরসরকার।কিন্তু সেই জরুরি অবস্থা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসে ছাত্রছাত্রীদের মিছিল। নয় বছরের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেয়ে মুক্তবাতাসে নিঃশ্বাস নিতে ঢাকার রাস্তায় বেরিয়ে আসেন নাগরিকরা।সারাদেশে বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে সংঘর্ষে প্রাণ দেন আরও অনেকে। এভাবেই মিলনের মৃত্যুর ভিতর দিয়ে এরশাদের পতনের শেষ অধ্যায় রচিত হয়। ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ (জহিরুলহকমজুমদার, https://bangla.bdnews24.com/opinion_bn/archives/58785)।" আজ আমাদের সবচে জরুরি কাজ কেন শহীদ ডাক্তার মিলনের সতীর্থরা মনোনয়ন পেয়ে কাদের কাছে নির্বাচনে হেরে যায় তা অনুসন্ধান করা! পেশাজীবীরা কি এমনিতেই তাদের শপথ ভুলে সরল সঠিক পথ থেকে সরে গেছেন নাকি নির্লিপ্ত সমাজ জনপ্রিয়তা দিয়ে তাদেরকে বিতাড়ন করেছে?

আজ আমরা সেই আগেরই মতো বড়ো বড়ো জনসভা দেখছি। সে বিষয়ে আজ (২৪নভেম্বর ) মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, "রাজ পথে শক্তি দেখিয়ে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নির্বাচন হবেনা ( প্রথমআলোhttps://www.prothomalo.com/bangladesh/ixn8glxg52)।" তার বক্তব্য থেকে এ কথা বলা যায় -আমরা সঠিক পথ থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছি। আমাদের এখন থামতে হবে। এবং সেই কাজটি বিশ্ববিদ্যালয় তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে জাতি আশা করে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করে যে বিচারহীনতার সংষ্কৃতি চালু হয়েছিল সেই গভীর নর্দমা থেকে জাতিকে সঠিক পথ দেখাতে যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছিল - আজ আবার সেই মহান দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিতে হবে সেই আহবান মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণে আছে।

আজ হুমকির রাজনীতিতে জনগণ ভীত! আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষক সমাজকে আলোর পথ দেখাতে হবে। শহীদ মিলনের স্মৃতিস্তম্ভে কেবল একতোড়া ফুল কিংবা একটি আলোচনা সভা নয় - জাতীয় সমস্যার আরও গভীরে গিয়ে জাতিকে পথ দেখাতে হবে।

মহামান্য শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয়ের কথা বলেছেন যাতে আমরা জেগে উঠি- দেশের সুনাগরিক হিসেবে যে মহান দায়িত্ব শিক্ষকরা পেয়েছেন সেটা যেন পালন করি।মহামান্য আপনার আবেদনে আমরা সাড়া দেব। তবে যুগের পর যুগ যেভাবে শিক্ষকদেরকে অবহেলা করা হয়েছে তারও অবসানে আপনার সমর্থন চাই।শিক্ষকরা যাতে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারে সেই দাবিটি কি আমি আপনার কাছে বিনীতভাবে সীমিত পরিসরে করতে পারি? 

মহামান্যর আরেকটি আক্ষেপ - শিক্ষক নিয়োগে যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয় মেধাকে মূল্যায়ন করে।আমার জানা মতে, আপনার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে কিভাবে মেধাকে অবমূল্যায়ন করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। মহামান্য আপনি জানেন কোন কোন শিক্ষক বা উপাচার্য/প্রো-উপাচার্য দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা তো জনগণের নেই- কেবল আপনার আছে। ন্যায় বিচারের স্বার্থে আপনি অবিলম্বে তাদেরকে অপসারনের ব্যবস্থা নেবেনকি?

শিক্ষকদের বিবেক জাগরণের পাশাপাশি জাতি আপনার কাছে উপাচার্য অপসারণের মতো কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে- সরকার যেভাবে বাধ্যতামূলক অবসর দিচ্ছে ঠিক একই ভাবে।দুর্নীতিবাজ উপাচার্যদের সরিয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে কালিমা মুক্ত করতে আপনার কাছে আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষকদের আকুল আবেদন আদেও পৌঁছাবে কি?মহামান্য ক্ষমা করবেন; আমাদের অপারগতার জন্য- ক্ষমা করবেন আমার অবোধ প্রশ্নগুলোর জন্য-কারণ আমি তো এখনও ছাত্র -শিক্ষক হতে পারিনি!

লেখক: অধ্যাপক ডঃ ফরিদ আহমেদ
দর্শনবিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

কবিতা

প্রকাশ: ০২:০০ পিএম, ০১ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

গত সপ্তাহে বাসার বিদ্যুৎবিল পরিশোধ বিষয়ক না দাবী সনদপত্র খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ পেয়ে যাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক স্মৃতি-স্মারক। আমার দু'চোখের পাতা কেঁপে  ওঠলো। যেন পলকে চার দশক পেছনে ফিরে  গেলাম। ধুলোয় মলিন নথিপত্রের সঙ্গে লেপ্টে থাকা একখানা অসাধারণ কাব্যগ্রন্হ। ধূসর বিবর্ণ সে বইয়ের গা থেকে ময়লা সরিয়ে হাতে নিয়ে দেখি কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ' বই 'আমার সময়'

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বইটা আমার

হাতে এসেছিল। ছেঁড়া মলাট উল্টিয়ে আরও একবার চমকে যাই।

ভেতরে নিজ হাতে লেখা --

এম.. মান্নান

৬৪৫, মহসীন হল,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তাং ০৭- ১০- ৮৭ইং।

 

ভাবছিলাম, আমি কি এক সময়ে নামটা এভাবে লিখতাম? আমার হাতের লেখাটা এমন ছিল?

এখন কি এভাবে লিখতে পারব? মনে হয় কত যুগ-যুগান্তর ধরে স্বহস্তে কিছু লিখি না। কলমের পরিবর্তে আমরা সবাই এখন কিবোর্ডে আঙুল ছুঁয়ে থাকি। সারাক্ষণ চোখে চোখে লেগে আছি এক অবাক স্পর্শের সাথে।

 

) এটা এক দীর্ঘ কবিতার বই। মোট ছয়টি কবিতা নিয়ে তেতাল্লিশ পৃষ্ঠার কাব্য প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ সালে।

বোঝা যায়, তখনকার বই মেলার আয়োজনকে

সামনে রেখেই বোধকরি বাজারে আসে। অনিন্দ্য প্রকাশন, নবাবপুর রোড, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। প্রচ্ছদ মুদ্রন সে সময়ের তুলনায় চমৎকার দৃষ্টিনন্দন। কবিতাগুলোর শিরোনামও ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক এবং চমকপ্রদ 

 

'আমার সকল কথা'

'আমার সময়'

'পরিচিত পথঘাট'

'আমি এখন যাবার জন্যে তৈরী'

'এখন ভয় করে না'

'আমার গোপন ব্যথা'

বইটি কবি তাঁর মা'কে উৎসর্গ করেছেন।

লিখেছেন, "আমার মা কাকাতুয়া"কে --

 

) প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পরে পুনর্পাঠ করতে গিয়ে মনে পড়ছিল, ছাত্র জীবনে কবিতাগুলো যেন বাঁধ-ভাঙা আবেগের প্রগলভতা নিয়ে পড়েছিলাম। সে বয়সে রবীন্দ্র, নজরুলের বাইরে নাজিম হিকমত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মোহন রায়হান এঁরা ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। বাঁশী বা কেউ কথা রাখেনি, কবির মৃত্যু, বা জেলখানার চিঠি ইত্যাদি কবিতা থেকে দু'চার ছত্র মুখস্থ থাকা চা'ই। তখনকার দিনে কবিতা আওড়ানোর মধ্যেও একপ্রকার আভিজাত্য ছিল। আজকাল ক্যাম্পাসে কি হয় খুব জানতে ইচ্ছে করে। তবু বলা যায়, মুখস্হ যুগের অবসান হয়েছে। তবে কবিকে না পড়লে বলা যাবেনা, কী বিস্ময়কর খেদ মনোবেদনা নিয়ে পৃথিবীর অশ্রুত গান তিনি গেয়ে গেছেন। কেমন নিপুণ কারিগরের হাত দিয়ে নিজের শৈশব, কৈশোর, যৌবন বা বার্ধক্যের জলছবি তিনি এঁকেছেন। প্রকৃতির রূপ-রূপান্তর, বৃক্ষ লতাপাতা, নদী-নালা, দিগন্ত উন্মোচিত নিসর্গের সংগীত ভেসে আসছে তাঁর নির্বাচিত বর্ণমালায়। ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র এবং তৎকালীন পাকিস্তান এলিট সার্ভিসের সদস্য হয়েও মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তাঁর অপরিমেয় ভালবাসার এক আশ্চর্য চিত্র ফুটে ওঠেছে কবিতার প্রতিটি শব্দের গভীরে, অনুপ্রাসের গহীনে বা অন্ত্যমিলের বৃত্তাংশে। কবিরা নাকি কল্পলোকের বাসিন্দা হয় কিন্তু এই কবির দৃষ্টিতে যেন আষ্টেপৃষ্টে ধরা পড়েছিল আবহমান বাংলা, মা, মৃত্তিকা মানুষের ক্ষুদ্র জীবনকালের বিমূর্ত রূপের নিগূঢ় ভাষাচিত্র। বিশেষ করে তাঁর 'আমার সময়' কবিতাটি তখনও আমি বারবার পাঠ করেছি এবং মুগ্ধতা ভরে কল্পনা করেছি। দেখেছি চোখের আলোয় উদ্ভাসিত গাঢ় শ্যামল এক মনোজ্ঞ ক্যানভাস।

 

তিনি লিখেছেন--

আমার মা' চুল

লম্বা এবং কাল ছিল

কবর কি চুলের মত কালো?

বা --

এবং ইদানীং

আমি আমার বন্ধুদের

অনায়াসে এড়িয়ে চলি।

 

আমি কখনো

মেষ পালক ছিলাম না

অথচ গোধূলি এবং সন্ধ্যার

অন্তর্বতী বিষাদ

রাখালের বাঁশির মত

আমার সঙ্গে বাস করে।

অথবা --

আমার সময়ে যুবকেরা

হয় আত্মগোপন করতো

অথবা ধরা পড়তো

অথবা মরে যেতো।

আরও --

বৃক্ষ যেমন পাখির জন্য

ছায়া ধরে রাখে

নদী যেমন মাছের জন্য

কোল পেতে থাকে

কালো মেঘ যেমন ফুলের জন্য

বর্ষিত হয়

ফুল যেমন মৌমাছির জন্য

মধুময় হয়

আমি কিছু দিতে পারি না।

 

আমি কবিতার কিছু বুঝি না। লিখতে সাহসও করি না। যদিও কখনও কখনও কবিতা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। তবে মনে হয়, কবিতা কেবল শোনার বিষয়, ভাব ভঙ্গির বিষয়। ছন্দের টানেই রচিত হয় কবিতা, কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের সমন্বিত মিছিলের প্রতিধ্বনি পাঠকের কর্ণ থেকে হৃদয়ে দোলা দিতে পারে। কবিতা পড়ে এর যথাযথ অর্থ খোঁজা পাঠকের কাজ নয়। কবিতার জন্য প্রয়োজন একটি সংবেদনশীল কান এবং মন , যা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ' শব্দে উপমায় প্রস্ফুটিত হয়ে চারদিকে   ধ্বনিত হয়েছে।

 

) বইটির এক প্রান্তের ফ্ল্যাপে লেখা মন্তব্যও পাঠযোগ্য-

'আবহমান বাংলা বাঙালীর ইতিহাসের রক্তাক্ত পথ ধরে দেশ কাল সময়ের পটভূমিতে স্বদেশের প্রতি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ' প্রগাঢ় কন্ঠের দূরাগত ঝর্ণাধ্বনির মত মন্ত্রোচ্চারণ 'আমার সময়'কে বাংলাদেশের জাতীয় মহাকাব্য বললে অত্যুক্তি করা হয় না।

সেই সঙ্গে খালিদ আহসানের সাবলীল রঙ রেখার টানে রচিত হয়েছে এক আশ্চর্য ধাতব সঙ্গীত নির্ঝর'

 

) সত্তুরের দশকের শেষ দিকেই কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ ' মৌলিক কবিতাগুলো জনপ্রিয়তার বিচারে উচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছিল।

বিশেষ করে তাঁর 'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' এবং 'বৃষ্টি সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা' নতুন প্রজন্মকে দারুণ ভাবে আকৃষ্ট করেছিল। আবৃত্তি শিল্পী বা বাচিকগন তাঁর কবিতাকে স্বকন্ঠে লালন করে নিজেরাও আলোচিত হয়েছেন। বলা যায়, আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি এই কবিতাটি স্বাধীনতােত্তর কালের সর্বাধিক জনপ্রিয় কবিতার অন্যতম প্রধান একটি।

এই কবিই বলেছেন,

 

"আমি কিংবদন্তির কথা বলছি

আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি,

বা

জিহবায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানেনা সে আজন্ম

কৃতদাস থেকে যাবে"

 

জয়তু কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর

কাব্যগ্রন্হ 'আমার সময়'



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে, প্রাণিবীমার সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার: আমাদের করনীয়

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ০১ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ একটি ঝুঁকিপূর্ণ খাত। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু প্রভাবজনিত কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দূর্যোগ কিংবা নিত্যনতুন অনিয়ন্ত্রিত রোগ-ব্যাধি সংক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটিকে বাণিজ্যিকীকরণে বাঁধাগ্রস্থ করছে। অথচ এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে ১ কোটি ৪ লক্ষ পরিবার। শুধু তাই নয়, নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র বিমোচন, মেধাবী জাতিগঠন ও গ্রামীন অর্থনীতিতে রয়েছে প্রাণিসম্পদের বিশাল অবদান।

বীমা এমন একটা ফিনেন্সিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট যা দিয়ে সোসাইটির রিস্কটাকে বহন করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষত উন্নত দেশগুলোতে বীমাখাত অত্যন্ত সম্প্রসারিত। বীমার অবদান জিডিপির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদের বীমার অবদান ১% এরও কম। তবে বাংলাদেশেও বীমার সম্প্রসারণ এবং এতে অবদান বৃদ্ধির অনেক সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে বীমা কোম্পানি এবং বীমা গ্রহীতা দু-পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা করে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। তবেই এটি স্থায়ীত্বশীল এবং গ্রহণযোগ্য হবে।

প্রা্ণিসম্পদ উন্নয়নে প্রাণিবীমা জরুরি। কারন প্রানিসম্পদ উন্নয়নে গবাদিপ্রানী পালন বাড়াতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক/এমএফআই) থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা জরুরি। প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ খামারীকে ঋণ দিবে। তবে সেই ঋণ ইন্সুরেন্স বেইজড হতে হবে। অর্থ্যাৎ ব্যাংক যখনই কাউকে ঋণ দিবে, ঋণের টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তার জন্য অবশ্যই প্রাণির বীমা করতে হবে। এক্ষেত্রে বীমা করাটা কিছুটা বাধ্যতামূলক হওয়া জরুরি।

প্রানিবীমা সম্প্রসারণের জন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগ, বীমা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক/এমএফআই), এনজিও সহ সকল স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য প্রাণিবীমা নীতিমালা/ কৌশলপত্র প্রনয়ণ করা প্রয়োজন। যেখানে প্রাণিসম্পদ বিভাগ প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ফ্যাসিলিটি সমন্বিত আধুনিক প্রাণিসম্পদ ডাটা ব্যাংক ব্যবস্থাপনা করবে যার মধ্যে ফার্ম রেজিষ্ট্রেশন, সার্ভিলেন্স সিস্টেম, কম্পিউটর নেটওয়ার্ক ডাটাবেইজ, ডিজিস প্রেডিকশন সিস্টেম, আরলি ওয়ারনিং সিস্টেম, একক বা সামষ্টিক মৃত্যুহার, ডিজিস ম্যাপিং, এনিমেল মর্টালিটি ম্যাপিং থাকবে। এই ডাটাবেইজ থেকে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো রিস্ক এসেসমেন্ট করে তাদের প্রিমিয়াম ক্যালকুলেশন করবে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গবাদিপ্রাণী সনাক্তকরণ থেকে শুরু করে তাদের ট্রেসিং আউট করা, বীমা পদ্ধতি ডিজিটালাইজেশন ও খামারি বান্ধব করা, টেকনোলজির মাধ্যমে প্রোডাক্ট সেল বাড়ানো, প্রোডাক্টের অপারেশন কষ্ট কমানো, খামারিদের ভ্যালু এডেড সার্ভিস প্রদান করা প্রভৃতি কাজ করবে। বীমা কোম্পানীর নিকট অনেক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাদের সার্ভে রিপোর্ট এবং বিভিন্ন রিপোর্ট পেতে সময় লাগে, যার কারণে আস্থার একটি সংকট দেখা যায়। এক্ষেত্রেও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সেবা সহজীকরণ ও দ্রুততা নিশ্চিতকরণে মাধ্যমে আস্থা অর্জনে সহায়তা করতে পারে।

এনজিও গুলো মানুষের কাছে বীমা সুবিধার প্রচারনা করাতে সাহায্য করবে যাতে তাদের প্রাণিসম্পদ মৃত্যু ঋণ সুরক্ষা পায়। আর প্রিমিয়াম ইস্যুতে কৃষককে সহায়তায় রাষ্ট্র বা সরকার ১%, স্থানীয় সরকার ১% ও কৃষক ১% দেওয়ার বিধান করা যেতে পারে। এইভাবে আমরা প্রাণিবীমার পুরো সিস্টেমটাকে জনপ্রিয় করতে পারি। মাইক্রো ইন্সুরেন্স এর বিষয়ে বীমা আইন ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইনের কিছু জটিলতা রয়েছে যা নিরসন করা আশু প্রয়োজন।

অন্যদিকে প্রাণী যদি মারা না যায়, সে ক্ষেত্রে কৃষকের জন্য কিছু একটা বেনিফিট প্রদান, বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে রিস্ক কাভারেজ বীমা চালু করা, সরকারের দিক থেকেও বীমা খাতে সাবসিডির বিধান রাখা, প্রিমিয়াম হ্রাস করার মাধ্যমে বীমা কার্যক্রমটিকে আরও বেশী সম্প্রসারিত করা, রিলিফ নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে দুর্যোগকে বীমায় কনভার্ট করা প্রভৃতি বিষয়ে নীতি নির্ধারনী পর্যায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন। এর জন্য একটা ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করে স্বল্প সময়ের মধ্যে নীতিমালা প্রণয়নের একটা পরিকল্পনা হাতে নেয়া জরুরি। প্রাণিসম্পদ খাতে বীমার সুবিধা দিলে জনগণ অধিক উৎপাদনশীল গাভী পালনে উৎসাহিত হবে, বিনিয়োগ সুরক্ষিত হবে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা বাড়বে।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

আস্থাশীল, টেকসই পুঁজিবাজার গড়তে চাই


Thumbnail

রূপকথা নয়, রূপান্তরের বাংলাদেশ। ক্ষুধা, দারিদ্র্যের বৃত্ত ভেঙে, সব আশঙ্কা পেছনে ফেলে বর্তমান বাংলাদেশ অপরাজেয়-অপ্রতিরোধ্য এক নতুন বাংলাদেশ। শ্যামল-সুন্দর নদীতীরের কোটি মানুষের অদম্য শক্তির উন্মাদনাই স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে রূপান্তরের বাংলাদেশের নতুন পরিচয়। অর্থনীতি, উদ্যোগ, শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যে প্রশ্নাতীত সাফল্যের হাত ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অপূর্ব মেলবন্ধন এখন বাংলাদেশ।

তবে মহামারি করোনাভাইরাসের আঘাত শেষ না হতেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির  থাবা পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে। এর উত্তাপ লেগেছে বাংলাদেশেও। এরই মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সর্বস্তরের মানুষের জীবনযাপনে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ এখন চরম ভোগান্তিতে রয়েছে। তাদের আয় নেই, অথচ খরচ বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতি আর বাড়তি খরচের এই ক্রান্তিকালে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আয়ের কেন্দ্র হতে পারত পুঁজিবাজার। একটি পরিণত, আধুনিক ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও একে মোকাবেলার শক্তি পেত মানুষ। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেটি করা সম্ভব হয়নি।   

তবে এখনো সব কিছু শেষ হয়ে যায়নি। আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সমৃদ্ধ-স্বনির্ভর সোনার বাংলা গড়তে হলে আর্থিক খাতের অন্যতম অংশ পুঁজিবাজারকে আমূল বদলে দিতে হবে। এ অবস্থায় ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসতে চাই আমরা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে বসুন্ধরা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেড চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বা কৌশলগত বিনিয়োগকারী হওয়ার আগ্রহ দেখায়। আনন্দের বিষয় হলো, আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছি। এখন আমাদের লক্ষ্য থাকবে, কিভাবে এই পুঁজিবাজারকে সর্বসাধারণের জন্য সমান সহায়ক আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপ শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের ভালো-মন্দ বিবেচনায় রাখে। আমাদের স্লোগানই হলো ‘দেশ ও মানুষের কল্যাণে’। আমার বড় ভাই বসুন্ধরা গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান সাদাত সোবহান তানভীর এই স্লোগানটি ঠিক করে দিয়েছিলেন।

সেই থেকে আমরা সবাই এই বাক্যটিকে ব্রত হিসেবে নিয়েছি। আমাদের একটি বড় লক্ষ্য হলো, দেশের মানুষের কল্যাণ সাধন করা। নানাভাবে আমরা তা করে যাচ্ছি। তবে আর্থিক খাত তথা পুঁজিবাজারের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে কিছু কাজ করার সুযোগ পেয়ে ভালো লাগছে। আশা করি, এখানেও আমরা লক্ষ্য পূরণে সমর্থ হব।

এরই মধ্যে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। সিএসইকে প্রযুক্তিবান্ধব করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানো হচ্ছে। বিশেষ করে আধুনিক কারিগরি ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে উন্নত ও প্রযুক্তিবান্ধব করে পুঁজিবাজারকে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দেওয়া আমাদের অন্যতম লক্ষ্য, যাতে করে মানুষ তাদের সঞ্চিত ৫-১০ হাজার টাকাও দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করতে পারে। এখান থেকে মুনাফা করতে পারে। কোনো ব্যাংকেও যেন অলস টাকা পড়ে না থাকে। অলস টাকা অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক বিষয় নয়।

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষ ব্যাংক-বীমার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করে, যা তাদের আয়ের ভিন্ন একটি উৎসও বটে। এই আয় থেকে বছর শেষে বা হলিডেতে ঘুরতে বাড়তি টাকা ব্যয় করতে পারে তারা। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের বড় দুটি ধসের ঘটনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে। মানুষ চরমভাবে ঘাবড়ে গেছে। এমনকি পুঁজিবাজারের নাম শুনলেই অনেকের মনে নেতিবাচক প্রশ্নের উদয় হয়। বেশির ভাগ মানুষই এখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আস্থা পায় না। এমনকি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আমাদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে ভয় পায়। মূলত পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতি, দুষ্টচক্রের কারসাজির ভীতি ও অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ায় এমনটি হচ্ছে।

দুটি ঘটনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কগ্রস্ত করলেও তাদের আস্থা ফেরানোর খুব কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আমরা সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা করে, সহজ পদ্ধতিতে মানুষের মনে হারানো ভরসার প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতে চাই। তারা যেন আবারও পুঁজিবাজারকে বিশ্বাস করে, বিনিয়োগ করে। এটি যেন তাদের কায়ক্লেশের সংসারজীবনে নিয়ামকের ভূমিকা রাখে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বা কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে এবিজি লিমিটেড সবার আগে তথ্যের সহজ প্রাপ্তি নিশ্চিতে কাজ করবে। পাশাপাশি সিএসইর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের নিয়মিত লেনদেনে নজরদারির ব্যবস্থা করবে। যেন কেউ কৌশলে বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নিতে না পারে। এ জন্য অবশ্যই পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।

আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (এনএসই) দৈনিক গড়ে ২২ হাজার ৭২৪ কোটি রুপি লেনদেন হয়। অথচ বাংলাদেশের দুটি স্টক এক্সচেঞ্জে দৈনিক গড় লেনদেন হাজার কোটিরও নিচে। এখন অনেকেই বলবেন, তাদের জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি, ওদের অর্থনীতির পরিধি বড়, ওদের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কম্পানির সংখ্যা বেশি। কিন্তু আমাদের জনসংখ্যাও তো সাড়ে ১৬ কোটি ছাড়িয়ে। আমরা তো বিনিয়োগের জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের দিক থেকেও পিছিয়ে আছি! তাহলে আমাদের লেনদেন কেন তাদের সাত ভাগের এক ভাগ হবে না? আমাদের পুঁজিবাজারে কেন বড় মূলধনী কম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হবে না? আমাদের পুঁজিবাজারে কেন বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে না? কেন আস্থা ফেরানো যাবে না? আমি মনে করি এটা সম্ভব।

এনএসই নিয়ে একটি তথ্য জানাই, ২০২১ সালে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যেও বিশ্বের বৃহত্তম ‘ডেরিভেটিভ এক্সচেঞ্জ’ হয়েছিল ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই)। আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিউচারস ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (এফআইএ) পরিচালিত পরিসংখ্যানে ওই তথ্য উঠে এসেছিল। পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জেসের পরিসংখ্যানেও ট্রেডের সংখ্যার ভিত্তিতে নগদ ইকুইটিতে এনএসই বিশ্বের চতুর্থ স্থানে রয়েছে। আমরা আছি তালিকার একেবারে শেষের দিকে। এর কারণ হচ্ছে পরনির্ভরশীলতা। প্রযুক্তির জন্য আমাদের উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। নতুন কিছু শুরু করতে গেলে প্রথমেই বলা হয়, আমাদের দিয়ে সম্ভব নয়। কিন্তু কেউ তো মায়ের গর্ভ থেকে সব কিছু শিখে আসে না। নতুন কাজ, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন অভিজ্ঞতা। প্রয়োজনে আমরা কাউকে পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে হলেও কাজ আদায় করে নেব। কিন্তু কাজটির দায়িত্বে আমাদের থাকতেই হবে। না হলে আমাদের দেশে আয় করে, এ দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে নিয়ে যাবে বহুজাতিক কম্পানিগুলো।

খেয়াল করে দেখুন, বাংলাদেশে ব্যবসারত টেলিকম কম্পানিগুলোর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহকসংখ্যা আট কোটি ৪০ লাখ, রবি আজিয়াটার গ্রাহকসংখ্যা পাঁচ কোটি ৪৮ লাখ, বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন লিমিটেডের তিন কোটি ৮৫ লাখ। সেখানে বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাধীন টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের গ্রাহকসংখ্যা মাত্র ৬৭ লাখ। বাংলাদেশ সরকারের আইনের পরিপালন করে অন্য বহুজাতিক কম্পানিগুলো টেলিকম ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা বিদেশে নিয়ে গেলেও টেলিটক সেই প্রতিযোগিতায় নেই। এর মূল কারণই হলো ‘আমরা পারব না’—এই ভীতি। একই সঙ্গে বিদেশি কম্পানিগুলোর প্রতি আমাদের বাড়তি আগ্রহ।

বর্তমানে দেশে সীমাহীন ডলারসংকটের পেছনেও বহুজাতিক কম্পানিগুলো দায়ী। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে হাজার কোটি টাকার মুনাফা করলেও নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ সীমিত। ফলে টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে। অথচ বিদেশি বহুজাতিক কম্পানিগুলোকে দেওয়া বিনিয়োগের সুবিধার অর্ধেকও যদি দেশীয় কম্পানিগুলোকে দেওয়া হতো, তবে আজকের পরিস্থিতি অন্য রকম থাকত। কারণ, আমরা ব্যবসা থেকে যে মুনাফা করি তা আবার দেশেই বিনিয়োগ করি। দেশীয় শ্রমবাজারই আমাদের প্রধান শক্তি।

বসুন্ধরা গ্রুপ সব সময়ই আমদানি বিকল্প দেশীয় পণ্য তথা দেশজ উৎপাদনে গুরুত্বারোপ করে আসছে। দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় অসংখ্য পণ্য এখানে উৎপাদন করে আসছে। শুধু তা-ই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বহু পথ খুলেছে। দেশের ক্রান্তিকালে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। দেশের আইন ও নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ভূমিকা রাখছি। একইভাবে পুঁজিবাজারেও আমরা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে চাই, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আবার তাদের হারানো আস্থা ফিরে পায়।

কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর বড় কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সেরকম পদক্ষেপ নিতে চাইলে গেল বছরই ছিল অত্যন্ত মোক্ষম সময়। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে সব কিছু স্থবির হয়ে পড়ে। ওই পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬৮টি কম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছিল ৩০০টির। এর মধ্যে ৭০টি কম্পানি ও ফান্ডের শেয়ারদর বেড়েছিল ১০০ শতাংশের বেশি। পুঁজিবাজারের এমন নজিরবিহীন উত্থানের পরও আমরা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করে তুলতে পারিনি। বা যারা ওই সময় পুঁজিবাজারে এসেছে তারাও পরবর্তী সময়ে জুজুর ভয়ে সাইডলাইনে চলে গেছে। কিন্তু আমরা যদি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকে নিরাপদ করতে পারতাম তবে মধ্যবিত্তদের বাড়তি আয়ের উৎস হতে পারত চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।

আমাদের দেশে বিনিয়োগ করে বহুজাতিক কম্পানিগুলো মুনাফা করে হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের তেমন আধিক্য নেই। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে সিএসইতে মাত্র এক কোটি ৪১ লাখ টাকার বিনিয়োগ এসেছে। একই সময়ে ডিএসইর বিদেশি বিনিয়োগ নেমে আসে গেল সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে। সিএসইতে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ পাশাপাশি ডেরিভেটিভ ও অপশন মার্কেটও চালু করার জন্য প্রস্তুত করা হবে। আজ যে স্বপ্নের যাত্রা শুরু হচ্ছে তার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হতে সময় লাগবে তিন বছর। ৩৬ মাস পর আপনারা নতুন এক সিএসই দেখবেন। যেটা হবে আরো আধুনিক, আরো নিরাপদ। থাকবে পুরোপুরি ডিজিটালাইজড অটোমেশন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গেই তা সেটলমেন্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ ক্রেতা শেয়ার বুঝে পান, আর বিক্রেতা বুঝে পান অর্থ। কিন্তু আমাদের সেটলমেন্ট সাইকেল এখনো টি-২। অর্থাৎ শেয়ার কেনার দুই দিন পর শেয়ারটি বিক্রি করা যায়। একইভাবে শেয়ার বিক্রির টাকাও দুদিন পর বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে পৌঁছায়। মাঝের সময়ে টাকাটা থাকে ব্যাংকিং চ্যানেলে। এই সময়ে অর্থগুলো ব্যবহার করে মুনাফা হাসিল করছে ব্যাংকগুলো। অথচ বিনিয়োগকারীরা এই অর্থের কোনো সুবিধাই পান না। আমাদের ট্রেড সাইকেল পরিবর্তন করা উচিত। এবিজি লিমিটেড এই অবস্থা পরিবর্তনে কাজ করবে। বিনিয়োগকারীরা নিজেদের ইচ্ছামতো যখন খুশি শেয়ার কিনবেন, যখন খুশি বিক্রয় করবেন। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে আসবেন।

সেকেন্ডারি মার্কেটের পাশাপাশি আমাদের প্রাইমারি মার্কেট ও স্মলক্যাপ (ছোট মূলধনী কম্পানি) মার্কেটেও সংস্কার আনতে হবে। কারণ, নামসর্বস্ব কম্পানিগুলো ভুয়া প্রসপেকটাস দাখিল করে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এর সঙ্গে ইস্যু ম্যানেজার ও অডিট কম্পানিগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। কিন্তু সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই ইস্যুগুলো বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে অনেক কম্পানি পুঁজিবাজারে আসার পর দেউলিয়া হয়ে গেলেও বিনিয়োগকারী অর্থ ফেরত পাননি। এমন পরিস্থিতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া মানুষের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। এবিজি লিমিটেড ও সিএসই যৌথভাবে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করবে।

দেশে সরকারি-বেসরকারি বহু কম্পানি হাজার কোটি টাকা মুনাফা করলেও প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসছে না। কারণ পুঁজিবাজারে এলে বছরে চারটি প্রান্তিকে আর্থিক হিসাব দিতে হবে, বিনিয়োগকারীদের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ও দেখাতে হবে। বছর শেষে করতে হবে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)। ফলে ইচ্ছা করলেও কম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অর্থপাচার কিংবা আত্মসাৎ করতে পারবেন না। স্বচ্ছতার আওতায় আসতে হবে। এটা তাঁরা করতে চান না। তাই সরকারের পক্ষ থেকে বড় মুনাফাধারী বহুজাতিক কম্পানির কর সুবিধা কমিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা উচিত। এতে পুঁজিবাজারের মূলধন বাড়ার পাশাপাশি গভীরতাও বাড়বে। বিনিয়োগকারীরাও পুঁজিবাজারে আগ্রহ পাবে।

বড় কম্পানিগুলো যেমন পুঁজিবাজারে আসতে চায় না, ঠিক তেমনি কিছু কম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে চাইলে তাদের নানা চড়াই-উতরাই পার হতে হয়। যেমন ধরুন—কোনো কম্পানি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অর্থ উত্তোলনের জন্য বিএসইসিতে আবেদন করেছে। কিন্তু কম্পানিটিকে অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২২ সালে। কিন্তু এর মধ্যেই কম্পানি ব্যাংকে ধারদেনা করে সম্প্রসারণের কাজ শেষ করেছে। এমনটি হওয়া উচিত নয়। নতুন কম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা উচিত। পাশাপাশি শুধু এনআইডি ও মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে বিও অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ থাকা উচিত। এতে করে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হবেন।

সাধারণ বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও বিনিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করা উচিত। তাঁদের পুঁজিবাজারে আনতে শক্তিশালী একটি ইউনিট খুলতে হবে। এই ইউনিট থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগের জন্য প্রলুব্ধ করা হবে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ কৌশল শেখানোর পাশাপাশি তাঁদের সহজ শর্তে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রাখতে হবে।

মোটাদাগে, বাংলাদেশ যেভাবে উন্নয়নের সোপানে নতুন নতুন সাফল্যের ভিত রচনা করছে, তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে একটি সুষম, সুশৃঙ্খল ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হবে। আর এই লক্ষ্যে যত ধরনের সেবা ও সহায়তা প্রয়োজন সব নিয়েই বিনিয়োগকারীদের পাশে থাকতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বসুন্ধরার এবিজি লিমিটেড।

উন্নত বিশ্বের অর্থনীতি আজ ডিজিটাল অর্থনীতি। বাংলাদেশ সরকারের ভিশন-২০৪১ পূরণের লক্ষ্যে মূল ভূমিকা রাখবে এই ডিজিটাল অর্থনীতি। আর এ ক্ষেত্রে এবিজি লিমিটেড পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ডিজিটাল অর্থনীতির দেশে রূপান্তরিত করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। পুঁজিবাজার ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে আমরা চাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে, যার মাধ্যমে অংশীদার হতে চাই ডিজিটাল অর্থনীতির বাংলাদেশ গড়তে।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

সমাবেশ, সংলাপ ও নির্বাচন


Thumbnail

রাজনীতির ময়দানে সংলাপ, সমাবেশ ও নির্বাচন খুবই প্রাসঙ্গিক ও প্রাচীন আলোচনা। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে শব্দ তিনটির উত্তাপ বরাবরই বেশি। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর হাতে একটি স্মার্ট রাজনীতির প্রেক্ষাপট রচিত হলেও ১৯৭৫ এর আগস্ট পরবর্তী সময়ে সেই রাজনীতির ধারাবাহিকতা মুখ থুবড়ে পড়ে। জন্ম নেয় বিশৃঙ্খল একটি নয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থা। যার ফলশ্রুতিতে দেশের পরবর্তী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জাতীয় নির্বাচনগুলোর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিলোনা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র ক্ষমতার নিমিত্তে মাঠের লড়াই চালিয়ে গেছে, গণতন্ত্র অর্জনের জন্য নয়। উদাহরণস্বরূপ ১৯৭৭ সালের হ্যাঁ / না ভোট, ৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচন কিংবা ২০০১ সালের প্রহসনমূলক নির্বাচনকে উল্লেখ করা যায়। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান দেশের সংবিধান এবং সেনা বিধান লঙ্ঘন করে এই কাজ করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ক‌্যু, পাল্টা ক‌্যুতে গণতন্ত্র ছিলো নির্বাসিত। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সময়ে ৮৬ ও '৮৮ সালে দুটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। এই দুই নির্বাচনেও গণতন্ত্র ছিলো উপেক্ষিত। ৯০’র আগ পর্যন্ত তো স্বৈরশাসকরাই চালিয়েছে দেশ। দেশের মহামান্য আদালতও সেসব শাসনকালকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

আমরা যদি ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি বাক বদল হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের ইতিহাসে ২০০৮ সালের নির্বাচনটি ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। যদিও গণতন্ত্রের শত্রুরা সেবারও নানা টালবাহানায় নির্বাচন বানচাল করতে চেয়েছিলো। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যমতে, খালেদা জিয়ার দাবির প্রেক্ষিতে নির্বাচন ১১ দিন পিছিয়ে ১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের তারিখকে ২৯শে ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়। সেই শুরু এর পর কোনো নির্বাচনেই আর স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের শত্রুরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হবে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস থেকে। আইন অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে এ নিয়ে উত্তাপ ততই বাড়ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক সভা সমাবেশ করে যাচ্ছে। নির্বাচনকে ঘিরে জনসমাবেশে বিগত শাসকদের মত কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করে সরকার দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গণতন্ত্রের নতুন ভিত রচনা করেছে। যার একক কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার। সরকার চাইছে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের। আন্তর্জাতিক মহলও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায়।

নির্বাচন পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংলাপের ইঙ্গিত দিচ্ছেন কতিপয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক তবে সংলাপ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের অবস্থান বলা যায় অনেকটা স্পষ্ট করেছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সদ্য অনুষ্ঠিত হওয়া মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করে বলেন, অনেকেই বলেন সংলাপ করতে হবে,আলোচনা করতে হবে।কিন্তু কাদের সঙ্গে? ওই বিএনপি খালেদা জিয়া,তারেক জিয়া! সাজাপ্রাপ্ত আসামি!যারা গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। যে খালেদা জিয়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা বিরোধী দলের নেতাও কোনদিন হবে না,হতে পারবে না।আর আওয়ামী লীগ,একশ বছরেও ক্ষমতায় যাবে না।আল্লাহতাআলা এই ধরনের গর্বভরা কথা পছন্দ করে না বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।তিনি বলেন, এই ধরনের গর্বভরা কথা বাংলাদেশের মানুষ তো একেবারেই পছন্দ করে না। সেজন্য খালেদা জিয়ার মুখের কথা তার বেলায়ই লেগে গেছে। ’ সুতরাং শেখ হাসিনার বক্তব্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন করে নির্বাচন পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংলাপের কোন সম্ভবনা নেই।

ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন মুখোমুখি। সঠিক ও সুষ্ঠ নির্বাচনে যাদের বিশ্বাস নেই তারা ইভিএম এর মত প্রযুক্তির বিরোধীতা করবে এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে, নির্বাচনে যত এগিয়ে আসছে ততোই বিএনপি বা অপশক্তির দোসরদের বড় আস্তানা নির্মাণকারীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৌড়াদৌড়ি বাড়াচ্ছে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থাকে তথ্যগত ভুল বুঝিয়ে নির্বাচন কে প্রভাবিত করার পুরাতন কূটকৌশল শুরু করে দিয়েছে । এদিকে অপকৌশল ও অপরাজনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন গুলোকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। তার সবগুলো জনসম্মেলনই জনসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে। বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন দল তবুও বিভিন্ন পর্যায়ে সমাবেশের নামে অপ-রাজনৈতিক টোটকা ব্যবহার করে যাচ্ছে। আজকাল নতুন রূপে উন্থান হওয়া কিছু নব্য বিএনপি বা নালিশ পার্টির সদস্য নিজেরাই হামলা করে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

তবে যেকোনো মূল্যেই দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সফল করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি জনগণ আর সেই জনগণ তাদের ভোটিং পাওয়ারের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে এমনটাই স্বাভাবিক। স্বাধীনতা বিরোধী কোনো পক্ষ যেন জনগণের সেই অধিকারকে বানচাল করতে না পারে সেজন্য কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। চতুর্থ শিল্প বিল্পবের যুগে এখন বিশ্ব। চারিদিকে প্রযুক্তির জয়জয়কার। অথচ একটি পক্ষ চাচ্ছে ভোট হবে প্রাচীন পদ্ধতিতে। যারা এখনও এধরনের অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনা লালন করে তাদের হাতে দেশ কতটা ভালো থাকবে তা সহজেই অনুমেয়। নির্বাচনকে সুষ্ঠু এবং পক্ষপাতহীন করতে ইভিএম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিশেষজ্ঞরাও এ বিষয়ে একমত।

বিএনপির মত অগনতান্ত্রিক দলগুলোর জন্য পরামর্শ থাকবে আপনারা জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করুন প্রথমে। রাজনীতি অর্থই জনগণের সেবা করা। সেই কাজ বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করা যাবেনা। মনে রাখবেন দেশের মানুষ তখনই আপনাদেরকে বেছে নিবে যখন আপনারা তাদের কল্যাণে কাজ করবেন। আপনাদের বিগত আন্দোলনের জ্বালাও পোড়াও কর্মসূচী দেশের সাধারণ মানুষকে ভূগিয়েছে, তাদের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যহত করেছে। তাই তারা আপনাদের সাথে নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অর্জন এদেশের কোটি কোটি জনতার ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাকে শক্তিতে পরিণত করে তিনি বিগত দুই দশকে দোর্দণ্ডপ্রতাপে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। দেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে তার উন্নয়নের ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন কর্ম লিখে শেষ করার মত নয়। নিজস্ব স‌্যাটেলাইট থেকে বাংলাদেশের মানুষের গর্বের প্রতীক হয়ে ওঠা পদ্মা সেতু। তরুন প্রজন্মের মেট্রোরেল থেকে রূপপুর পারমানবিক বিদ‌্যুৎ কেন্দ্র। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরসহ  বঙ্গবন্ধু টানেলের মাধ‌্যমে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে টানেল যুগে প্রবেশ। এক্সপ্রেস ওয়ে, শত শত ফ্লাইওভার, সেতু, শতভাগ বিদ‌্যুৎ, লাখ লাখ মানুষকে গৃহনির্মানে করে দেয়া, পুরো বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল। করোনাকালীণ সমেয় তা দেখিয়েছে চোখে আঙুল দিয়ে। কি করেনি আওয়ামী লীগ সরকার! তাই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দেশের আপামর জনসাধারণ জননেত্রী শেখ হাসিনাকেই বেছে নেবে এব্যাপারে আমরা শতভাগ নিশ্চিত। তবে দেশের প্রতিটি নির্বাচন কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর সৈনিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। কেননা পূর্বের ন্যায় স্বাধীনতার শত্রুরা সর্বদা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাদের সকল ষড়যন্ত্রকে ধুলিস্যাৎ করে দেশের মানুষের নির্বাচনী অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

জননেত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন বরাবরই উৎসবের আমেজ বয়ে আনে এদেশের মানুষের হৃদয়ে। দেশদ্রোহী অপশক্তিরা সবসময়ই নির্বাচন ও জননেত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালায়। শেষ সময় পর্যম্ত জনগণের ভালোবাসায় পরাস্ত হয় অস্ত্রের রাজনীতি ও মাফিয়াদের হুংকার। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে পরিশ্রম বিফলে যায় না জননেত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ আআওয়ামী লীগ সেটার প্রমাণ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অব্যাহত থাকুক সে ধারাবাহিকতা। জয়বাংলার নৌকা ছড়িয়ে যাক লাল-সবুজের প্রতিটি প্রান্তরে। জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কি সারা বছর চলবে?

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ৩০ নভেম্বর, ২০২২


Thumbnail

গত আড়াই বছরে করোনার তা-ব এবং আতঙ্কের পরে এখন চলছে ডেঙ্গু আতঙ্ক। অবস্থা প্রায় মহামারী পর্যায়ে। বিশেষ করে ঢাকা, কক্সবাজার এবং কিছু বড় শহরে। ডেঙ্গু রোগের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। ৯৯২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘চাইনিজ মেডিকেল এনসাইক্লোপেডিয়া’-তে ডেঙ্গু রোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তথ্য আছে। রোগটি প্রথমে বানরের মধ্যে বিস্তার লাভ করে। সেখান থেকে ‘এডিস ইজিপ্টাই’ নামের মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরে অনুপ্রবেশ। তবে রোগটি আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুটিকয়েক দেশে সীমিত ছিল শত শত বছর ধরে। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে জাহাজযোগে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে এডিস প্রজাতির এ মশা জাহাজে করে দেশান্তরী হয়। সাথে নিয়ে যায় ডেঙ্গু ভাইরাস। বর্তমানে প্রায় ১২৯টি দেশে ডেঙ্গু রোগ আছে।

আমাদের দেশে ডেঙ্গু জর প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৬৪ সালে। পরবর্তী ৬০ বছরে খুবই সীমিত আকারে সংক্রমণ ছিল বিক্ষিপ্তভাবে। আতঙ্ক তো ছিলই না, এমনকি খুব একটা পরিচিতিও ছিল না। প্রাদুর্ভাব ও আতঙ্ক নিয়ে হাজির হয় ২০০০ সালে। স্বাস্থ্যবিভাগ তো প্রথম দিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের কথা উচ্চারণ করতেই চায়নি। চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তখন একটা মিছিল বের করেছিল। মিছিলের ব্যানারে স্লোগান ছিল ‘অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ হয় না’। বাংলাদেশ স্কাউটস থেকে লিফলেট তৈরি, র‌্যালি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছিল বেশ জোরেসোরেই। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় বাংলাদেশ স্কাউটস হাসপাতাল চত্বরে তাঁবু ও ক্যাম্প খাট দিয়ে অস্থায়ী ডেঙ্গু হাসপাতাল পরিচালনাও করেছে

এরপরে প্রায় ২২ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ডেঙ্গু সম্পর্কে আলোচনা, পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তি, চিকিৎসা এবং সচেতনতা বেড়েছে। অন্ধ থাকেনি, কিন্তু প্রলয় বন্ধ হয়নি। প্রলয় বরং বেড়েছে। ডেঙ্গু ভাইরাসের ১, ২, ৩ ও ৪  নামে ৪টি সেরোটাইপ আছে। ২০০০ সালে সেরোটাইপ-১ দিয়ে সংক্রমণ শুরু হয়। ২০১৬ সালে সেরোটাইপ-১ এর সাথে সেরোটাইপ- ২ ও ৩ সংক্রমণে যোগ দিয়েছে। তখন থেকেই সংক্রমণ ও রোগের তীব্রতায় গতি পায়। জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বাংলাদেশের কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা থেকে প্রতীয়মান হয় ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেরোটাইপ-১ এর সংক্রমণই বেশি ছিল (৯১.৩%)। ২০১৮ সালে সেরোটাইপ-১, ২ ও ৩ এর সংক্রমণ ছিল প্রায় কাছাকাছি। হঠাৎ করেই ২০১৯ সালে সেরোটাইপ-৩ এর সংক্রমণ প্রায় সর্বগ্রাসী হয় (৯১.৮৬%)। এ ২০১৯ সালেই রোগীর সংখ্যা লক্ষাধিক এবং ১৭৯ জনের মৃত্যু ঘটে। পরের ২ বছর গতি একটু সীমিত থাকলেও এ বছর রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার ছুঁই ছুঁই, এবং মৃত্যু ঘটেছে ২৬০ জনের বেশি। শুধু নভেম্বরের ৩ সপ্তাহে ৯৩ জন রোগী মৃত্যুবরণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু।

প্রশ্ন উঠতেই পারে নভেম্বর মাসে বৃষ্টিপাতের লেশমাত্র নেই। এর পরেও রোগী এবং মৃত্যু বেশি কেন? এডিস মশা বদ্ধ স্বচ্ছ পানিতে ডিম পারে। মশার জীবনকাল গড়ে ৪০ দিন, কিন্তু একবার এ মশা সংক্রমিত হলে পুরো জীবনকালই  সংক্রমণ ঘটাতে থাকে। প্রতি ৩ দিন অন্তর ডিম পারে। কাজেই কম জীবনকাল হলেও একটু স্বচ্ছ পানি পাওয়া গেলে দ্রুত বংশ বিস্তারে এ মশার জুড়ি নেই। এক চায়ের চামচ বা একটা বোতলের ছিপির পানিই যথেষ্ট। জলবায়ুর পরিবর্তনে ভ্রমাত্মক বৃষ্টিপাত বেড়েছে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি ও কিছুদিন বিরতি পেলেই ছোট পাত্রে পানি জমে। আর আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভ্যাস নিকৃষ্টের মধ্যে অন্যতম। একবার মাত্র ব্যবহারযোগ্য কাপ, বোতল, পাত্র ছুড়ে ফেলার অভ্যাস আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। শিক্ষার হার, গড় আয়ু, ভোগ্যপণ্য ব্যবহার ইত্যাদি বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়েছে বর্জ্য। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এগুলো ছুড়ে ফেলার অভ্যাস। পানি জমার ছোট পাত্রের এখন অভাব নেই। ফলে ডেঙ্গু সারা বছর থাকার সুযোগ পাচ্ছে। নভেম্বরে তো মোটেই রেহাই দেয়নি। ডিসেম্বরেও থাকার আশঙ্কা খুব বেশি।

ডেঙ্গুর ৪টি সেরোটাইপের মধ্যে ১টিতে আক্রান্ত হলে পরবর্তীতে অন্য ০৩টি সেরোটাইপের যেকোন একটির সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। ৪টি সেরোটাইপের কারণে একজন ব্যক্তি ৪ বার ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু প্রথম সংক্রমণের পরে পরবর্তী সংক্রমণের তীব্রতা ও মারণঘাতী ক্ষমতা অনেক বেশি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং থাইল্যান্ডের মাহিদল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ডেঙ্গুর দ্বিতীয় ও পরবর্তী সংক্রমণের ভয়াবহতা অনেক বেশি। দ্বিতীয় ও পরবর্তী সংক্রমণে শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ঘটায়, লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যা হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরে রূপান্তর ঘটায়, তখন রক্তচাপ ও হদস্পন্দন হ্রাস পায় এবং শক সিনড্রোম শুরু হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ডেঙ্গুর প্রথম সংক্রমণে সৃষ্ট এন্টিবডি দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপের সংক্রমণে ভাইরাসকে প্রতিরোধ তো করেই না, বরং ভাইরাসের প্রতিলিপি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। যে কারণে রোগের তীব্রতা ও মারণঘাতী ক্ষমতা খুবই বৃদ্ধি পায়।

মশাবাহিত বলে ডেঙ্গু ভাইরাস কখনও নির্মূল হবে না। প্রতি বছর এর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে ও পাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি লোক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় ২২ হাজার মারা যায়। মৃত্যুর খতিয়ানে শিশুর সংখ্যা বেশি। গত ৫০ বছরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হ্রাস পাওয়ার কোন লক্ষণ নেই। ডেঙ্গু প্রতিরোধের ভ্যাকসিন তৈরির প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে ১৯২৯ সাল থেকেই। বর্তমানে ৬ পদ্ধতির ভ্যাকসিনের ট্রায়াল চলছে। মাত্র একটি তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে আছে। আশা করা যাচ্ছে ৫ বছর পরে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। কাজেই বর্তমান পর্যায়ে সচেতনতা ও রোগ ব্যবস্থাপনাই প্রধান ভরসা।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে রক্তের প্লাটিলেট সংখ্যা দ্রুত কমে। একজন মানুষের শরীরে প্রতি মাইক্রোলিটার রক্তে ১.৫ থেকে ৪ লক্ষ প্লাটিলেট থাকে। প্লাটিলেট রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। ডেঙ্গু সংক্রমণ ঘটলে ৮০% থেকে ৯০% রোগীর প্লাটিলেট ১ লক্ষের নিচে নেমে যায়। ১০% থেকে ২০% রোগীর প্লাটিলেট ২০ হাজারের নিচে নামে। রক্ত জমাট বাঁধার এ উপাদানটি দ্রুত কমে যাওয়ায় শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হয়। কাজেই, ডেঙ্গুর সময়কালে ভিটামিন, আয়রণ ও খনিজ লবণ সমৃদ্ধ ফল, শাক-সবজি বেশি খাওয়া উচিত। ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও ভিটামিন ‘কে’ সমৃদ্ধ খাবার রক্তের প্লাটিলেট বৃদ্ধি করে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এক সেরোটাইপের সংক্রমণে ডেঙ্গু রোগী যতো বাড়বে, পরবর্তীতে অন্য সেরোটাইপের সংক্রমণে ডেঙ্গু রোগের ভয়াবহতা ও মারণঘাতী ক্ষমতা ততো বেশি বৃদ্ধি পাবে। কাজেই এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক
ড. মিহির কান্তি মজুমদার, সাবেক সচিব।



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন